বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

শুদ্ধ চর্চা নৃত্যের প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যাঙ্গণ’

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রীয়াঙ্কা কর, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

যেখানে বার বার আঘাৎ এসেছে সেখানেই আবারও ঘুরে দাড়িয়েছেন নারীরা। জীবনের সকল মুহুর্তে স্বপ্ন দেখে চলা আর স্বপ্ন পূরণে নতুন করে এগিয়ে যাওয়াই যেনো নারীর অন্যতম বৈশিষ্ট। সুনামগঞ্জের মতো জায়গায় ব্যতিক্রমী কিছু করার জন্য অনেকেই চেষ্টা করেন। আর সে চেষ্টায় থাকা মানুষদের ভীড়ে যাদের নাম খুব সহজেই অনেকের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় তাদের একজন তুলিকা ঘোষ চৌধুরী। সমাজের আর দশজনের মতো সাধারণ জীবন যাপনে থাকা তুলিকা তার মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত। লোকজ সঙ্গীতের একজন তারকা শিল্পী হিসেবে তাকে চেনেন এই জেলা ও জেলার বাইরের অসংখ্য মানুষ। এর বাইরেও এই নারী পেশায় একজন শিক্ষক। গুণাবলীতে আছে নৃত্য প্রশিক্ষক প্রতিভার সুনামও। জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিশুদের কাছে তুলিকা ঘোষ একজন পরম স্বজন। যিনি আগ্রহ নিয়ে তাদের নৃত্য শেখান মমত্ব দিয়ে। তার প্রতিষ্ঠান ‘নৃত্যাঙ্গণ’ বর্তমানে জেলার সবচেয়ে শুদ্ধ চর্চা নৃত্যের নির্ভরতার জায়গা হিসেবে সুপরিচিত। গল্পে গল্পে সুনামগঞ্জ২৪.কম এর নারীমঞ্চ বিভাগের প্রতিবেদক খোঁজে ফিরেছেন ‘নৃত্যাঙ্গণ’র আদ্যোপান্ত।


যেভাবে শুরু পথচলা:
১৯৮৫ সালে জাতীয় শিশু বিষয় প্রতিযোগিতা থেকে সাধারণ নৃত্য প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে নৃত্যের প্রতি আকর্ষণের মাত্রা তুঙ্গে পৌছায় তুলিকা ঘোষ চৌধুরীর। বাবা মা গান করতেন, সেই থেকেই নৃত্যে আসা। বড় বোনদের বেশি আগ্রহতে নৃত্যে এসেছেন তিনি। নৃত্য শিখেছেন প্রথম গুরু বড় বোন চন্দ্রলেখা ঘোষ চৌধুরীর কাছে। এরপর সিলেটের বিপ্লব কর তাকে আরও শিখতে সহায়তা করেন। এভাবেই চর্চা চলমান রেখে লক্ষ্য অটুট ছিলো তুলিকা ঘোষ চৌধুরীর। এক সময়ে তার নৃত্য পরিবেশনা মঞ্চ মাতিয়ে তোলে।

যখন থেকে নিজেই নৃত্য শেখানো শুরু করলেন: জেলা শহরের আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন এর প্রধান শিক্ষিকা প্রয়াত অঞ্জুলী চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় এবং সহযোগিতায় প্রথম বারের মতো বাইরে নৃত্য শেখাতে শুরু করেন তুলিকা। ১৯৮৮ সালে এই বিদ্যাপীঠের ২ থেকে ৪জন শিক্ষার্থীকে নৃত্য শেখানোর কাজ শুরু করেন তিনি। প্রশিক্ষক হিসেবে তার যাত্রা শুরুহয় সে সময়ই। তখনও সংসার জীবন শুরু হয়নি তুলিকার। তবে বিয়ের পরেও তিনি পারিবারিক দিক থেকে এই কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন তার স্বামী অ্যাডভোকেট দেবদাস চৌধুরী রঞ্জণের কাছ থেকে। দেবদাস চৌধুরী রঞ্জণ নিজেও একজন প্রখ্যাত লোকজ সঙ্গীত শিল্পী। পাশাপাশি জেলা ও জেলার বাইরে একজন আন্তর্জাতিকমানের লোকজসঙ্গীত প্রশিক্ষক ও গবেষক। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সহযোগিতায় তুলিকা তার নৃত্যচর্চা ধরে রেখে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। যে সময়ে নারীদের মঞ্চপরিবেশনা ছিলো পুরুষতান্ত্রীক সমাজের চোখে বিষফোঁড়ার মতো। নানা প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে চলতে হয়েছে এই নারীর।

নৃত্যাঙ্গনের প্রতি সাড়া কেমন?: বাধা ভেঙ্গে এগিয়ে চলতে থাকা তুলিকা ঘোষ তার প্রতিষ্ঠান নৃত্যাঙ্গণের কাজ শুরু করার পর থেকেই ব্যপক সাড়া পান। নৃত্য শেখানোর পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরের উৎসব আয়োজনগুলোতে তার শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা যেনো উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলতে থাকে। লোকমুখে ছড়িয়ে পরতে থাকে নৃত্যাঙ্গণের নাম। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে চাহিদা প্রচুর । সম্প্রতি নৃত্যাঙ্গনের ১৮০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় একটি জাকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ছিলো এই প্রতিষ্ঠানের। সেখানে ছিলো জেলার বিভিন্ন প্রান্তের নানা বয়সি মানুষের ঢল। নৃত্যের প্রতি চাহিদা থাকলেও নৃত্যাঙ্গণের নিজস্ব ও বড়সর কোন প্রশিক্ষণ ভবন না থাকায় শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ি সুবিধা দিতে পারছেনা। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে চলছে নৃত্য প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ। এই কাজে আগ্রহ আছে প্রশিক্ষনার্থীদের অভিভাবকদেরও। তার মতে অভিভাবকরাও এখন নিজেরা নৃত্য করতে চান।

কিছু সফলতা: তুলিকা ঘোষ চৌধুরীর ছাত্রী পারমিতা দে তিন্নি ও সুমনা চৌধুরী কেয়া জাতীয় পর্যায়ে নৃত্য পরিবেশনা করেন । সুমনা চৌধুরী কেয়া সাংস্কৃতিক সফরে জাপান গিয়েছেন।
বর্তমানে নৃত্যাঙ্গণ থেকে নৃত্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৬০ জন ছাত্রী। ৪টা শিফটে ক্লাস হচ্ছে। পাশাপাশি সংগঠনে রয়েছে ১৮০ থেকে প্রায় ২০০ জনের সক্রীয় অংশগ্রহণ। যা শুরুতে ছিলো মাত্র ২০ জন।

প্রশিক্ষণ সম্পর্কে:জনপ্রতি ৫০০ টাকায় পুরো মাস নৃত্য শেখার সুবিধা পাচ্ছে ৬ বছর থেকে কলেজ পড়ুয়া পর্যন্ত ছাত্র ছাত্রীরা। তবে মেধা অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাবেও শেখাচ্ছে নৃত্যাঙ্গণ। সাপ্তাহের প্রতি বুধবার, বৃ্হস্পতিবার ও শুক্রবার শিশুদেরকে নৃত্য শেখানোর কাজে তুলিকা ঘোষ কে সহযোগিতা করছেন প্রশিক্ষক শ্রাবন্তী পুরকাস্থ, সহায়ক সামির পল্লব, অমিত বর্মণ, অহনা এস ও ক্রিসেনথীমাম অন্তরা।

যাদের কাছে কৃতজ্ঞ: নৃত্যাঙ্গণকে সমৃদ্ধ করতে গিয়ে যে শ্রম দিতে হয়েছে সেজন্য তুলিকা সবচেয়ে বেশী কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন প্রশিক্ষক শ্রাবন্তী পুরকাস্থ ও স্বামী দেবদাস চৌধুরী রঞ্জণের কাছে। পাশাপাশি সামির পল্লব, অমিত বর্মন এবং তার অভিভাবকবৃন্দের কাছেও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।


কিছু স্বপ্নের কথা:
বর্তমানে একজন সফল নারী তুলিকা ঘোষ চৌধুরী স্বপ্ন দেখেন নৃত্যাঙ্গণে যেসব শিশুরা শিখছে তারা যেনো শুদ্ধ চর্চায় তুলিকা কে অনুসরণ করে বা বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো ভালো মানের নৃত্য শিল্পী কে অনুসরণ করে। তিনি বলেন ‘এক সময় আমাদের সমাজের কিছু মানুষের যে ধারণা ছিলো মেয়েরা নৃত্য করতে পারবে না, মেয়েদের পিছিয়ে পড়ার সমাজ ব্যবস্থা ছিলো এ অবস্থাকে পেছনে রেখে মেয়েরা যদি সামনে আসতে পারে তাতেই আমি খুশি, আমার স্বপ্ন একদিন যেন নৃত্যাঙ্গণ একটি বড় প্রতিষ্ঠান হোক, আমার মৃত্যুর পরেও বাচ্চারা যেন এই প্রতিষ্ঠান কে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, দেশ-বিদেশে যেনো জানতে পারে নৃত্যাঙ্গণ একটি শুদ্ধ চর্চা নৃত্যের প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে সুনামগঞ্জ কে যেনো আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়’।

কিছু আনন্দ মুহুর্ত:সেদিন আনন্দ ছিলো চোখে মুখে, যেদিন নৃত্যাঙ্গণের শিশুরা ঘরে জাতীয় পুরস্কার এনেছিল। বর্তমানে নৃত্যাঙ্গণের শিশু শিল্পীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বড় বড় মঞ্চে যখন মনমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা করে হাজারো মানুষের ভালোবাসা পায় তখন একজন তুলিকার আনন্দের সীমা থাকে না। তুলিকা বলেন ‘বেশি ভালো লাগে বাচ্চারা যখন একসাথে সবাই বায়না ধরে, – বেড়াতে যাবে, নৌকা ভ্রমণ করবে এরকম নানা ধরনের আবদার থাকে ওদের, এরকম করলে আমার খুব বেশি আনন্দ লাগে’।

কষ্টের কিছু মুহুর্ত: বড় কোন কষ্ট নেই, কিন্তু যখন শিশু শিল্পীদের নিয়ে জেলার বাইরে পরিবেশনায় যেতেহয় তখন বাচ্চারা রাস্তায় অসুস্থ হয়ে যায়। এটা তুলিকার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহুর্ত। তবু বাচ্চাদের সাহস দেন তুলিকা। তিনি ভাবেন হয়তো এভাবেই কিছু কষ্টের শেষে ওরা একদিন তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবে।

নৃত্যাঙ্গণের প্রচার সম্পাদক অমিত বর্মন বলেন, ‘নৃত্যাঙ্গণ সংগঠনটা যেসময় করাহয় তারপর থেকে প্রশিক্ষক হিসেবে তুলিকা ঘোষ চৌধুরী এবং এর পরপরই শ্রাবন্তী পুরকাস্থ তাদের শ্রম দিতে থাকেন। বর্তমানের তুলনায় আগে সুনামগঞ্জে ছেলেদের নৃত্য খুবই কম হতো। এখন নৃত্যাঙ্গণের অনেক ছেলেরাই নৃত্যের সাথে জড়িত। বর্তমানে আমরা নৃত্যাঙ্গণের মাধ্যমে ঢাকাতে, সিলেটে এবং জাতীয় প্রোগ্রামগুলোর মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনা করছি। বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রী অনেক । বিশেষ করে অভিভাবকরা অনেক সচেতন নৃত্য শেখানোর জন্য।

নৃত্যাঙ্গনের সহযোগি অহনা এষ বলেন ‘নৃত্যাঙ্গণ এমনভাবে সবার মাঝে ছড়িয়ে গেছে যে সুনামগঞ্জ এর যে কোনো বৃহৎ পরিসরের অনুষ্ঠানে নৃত্যাঙ্গণকে সু্যোগ দেওয়াহয় নৃত্য পরিবেশনার জন্য। আমরা চাই নৃত্যাঙ্গণ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হোক’।

শিক্ষার্থীদের অনুভুতি: নৃত্য শিখছে ছাত্রী দিয়া। সে জানায় ‘অনুষ্ঠানে যখন নৃত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তখন আমাদের সবার খুন ভালো লাগে’। মৌমিতা বিশ্বাস অনুভুতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছে ‘একসাথে যখন মঞ্চে যাই নানা রঙের সাজ নিয়ে তখন অনেক অনেক মানুষ আমাদেরকে হাততালি দেন, তখন এতো ভালো লাগে’। শিক্ষার্থী শিপা আক্তার, মৌলি তালুকদার, আশিস বর্মণ ও ঝর্ণা আক্তারের মতে, মানুষের উৎসাহ ও ভালোবাসা পাওয়ার মাঝে অন্যরকম এক ভালোলাগা আছে, পরিবেশনার আগে থেকে শেষ অব্দি যে চিন্তা থাকে দর্শকের করতালিতে সব ক্লান্তি মুহুর্তেই মুছে যায়, এই ভালোলাগা নৃত্যাঙ্গণের প্রতিটি মানুষের কাছে বড় পাওয়া।

একজন নারী হিসেবে তুলিকা ঘোষ চৌধুরী সফলতা দেখিয়েছেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে। পুরুষের পাশাপাশি সমাজের সকল ভালোর সঙ্গে থাকার প্রত্যয় তাকে বিফল হতে দেয়নি কেবল তার আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোমের কারণে। বর্তমান সময়ে নৃত্যাঙ্গণ তার জায়গা করে নিয়েছে কাজের মধ্যদিয়ে। যার পেছনের গল্পে একজন নারী হয়েও তুলিকা ছিলেন অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টার ভুমিকায়। সুনামগঞ্জ ও এই জেলার মেয়েদের কে সামনে রাখতে নৃত্যাঙ্গণের চলমান কর্মযজ্ঞ প্রশংসা অর্জন করেছে সংস্কৃতিমনা মানুষদের।

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ পিকেপি/ এমএআই

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™