বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

মশালঘাটে জন্ম নেয়া একজন সঞ্চিতার গল্প

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রীয়াঙ্কা কর, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

আমাদের নিত্যদিনের প্রচন্ড ব্যাস্ততার ভীড়ে দেখা মেলে হরেক রকম মানুষের। নানা রঙের স্বপ্ন তাদের। নানা বর্ণের নানান চেহারার এসব মানুষের চাওয়াটাও হয়তো নানান রকম। তাই কর্ম তাদের ভিন্ন ভিন্ন। এমন একটা মানুষের গল্পই জানতে -জানাতে চাই। যার নাম সঞ্চিতা চৌধুরী।

জমিদার পরিবারে জন্ম নিলেও যিনি নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামেই কাটিয়ে দিয়েছেন জীবন। নারীকে দেখতে চেয়েছেন সাহসি ভুমিকায়। ১৯৫২ সালে বেহেলীর মশালঘাটে বাবা চিত্ত রঞ্জণ চৌধুরী ও মা সুপ্রভা চৌধুরীর সংসারে জন্মেছিলেন তিনি। বাবা- মা আদর করে নাম রেখেছিলেন সঞ্চিতা। তাকে ঘিরেই ছিলো তাদের স্বপ্নের সঞ্চয়। বেহেলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৈশব কাটে সঞ্চিতার। মাধ্যমিকে সুনামগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি সতিশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন তিনি। এইচএসসি ও ডিগ্রীতে সাফল্য দেখান সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে। বিএড শেষ করেন ময়মনসিংহ শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহা বিদ্যালয়ে।

এই নারী জীবনকে দেখেছেন ভীন্নতায়। চেয়েছেন সকলের সমান স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ। প্রতিবাদমুখরতা তাকে রেখেছে রাজপথে। জীবনের শেষ অংশে এসেও দমে যাননি। সঞ্চিত মনোবল প্রতিনিয়ত সফলতা দিয়েছে সঞ্চিতাকে। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থ্যায় নারীর প্রতি অন্যায় প্রতিহত করতে গিয়ে ঝাপিয়ে পরা তার নিত্যকার কর্ম। আজও বিয়ে করেননি সঞ্চিতা। এটা হয়তো তাকে নারীবাদি একজন হিসেবে আরও একটু আলাদা করে পরিচিত করতে সহায়ক। নিজের জীবন নিয়ে ভাবনার নাকি সময় হয়নি। এমন কথাই বলেন সঞ্চিতা।

১৯৭৩ সালে তার কর্মজীবন শুরু হয়। দিরাই গালর্স স্কুল এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৮১ সালে সুনামগঞ্জ শহরের সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে।

তখন সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মাত্র ৩জন শিক্ষক ছিলেন। ১জন প্রধান শিক্ষক আর বাকি ২ জন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তখনকার সময়ে এটা অবাক হওয়ার মতো নয় কেননা আপনি অবাক হবেন এটা শুনে যে তখন স্কুলে ছাত্রীরা খুব একটা লেখাপড়া করতো না। অভিভাবকরাও তাদের মেয়েদের স্কুলে দিতে প্রয়োজন মনে করতেন না।

সঞ্চিতা চৌধুরী আর শিলা রায় তখনকার সময়ে বাসায় বাসায় গিয়ে মেয়েদের স্কুলে আনার চেষ্টা করতেন। স্কুলটা ছিল ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত। ছাত্রী সংখ্যা ছিল ৬ষষ্ঠ শ্রেণীতে ২৫ জন, ৭ম শ্রেণীতে ৮ থেকে ১০ জন, ৮ম শ্রেণীতে সর্বোচ্চ ৯ জন। সঞ্চিতা বিনা বেতনে ৬ মাস চাকুরী করেন। পরবর্তীতে তার বেতন হয়েছিলো ৩০০ টাকা। সঞ্চিতা এ চাকুরী থেকে অবসর নেন ২০১১ সালে। চাকুরী জীবনে সঞ্চিতার মাধ্যমেই শুরু হয় -স্কুলের গালর্স গাইড ও মেয়েদের সব ধরনের খেলাধুলা । মেয়েদের নিয়ে আয়োজনগুলোতে সবকিছুর নেতৃত্ব দেয়া ও দেখাশোনায় সঞ্চিতাই ছিলেন অন্যতম।

সঞ্চিতার আন্দোলনমূখর জীবনের শুরুটা হয়েছিলো ১৯৬৯ সালে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। ১৯৭০ এ যুদ্ধের আভাস ছিল । তখন উত্তাল ছিলো পরিবেশ। হরতাল ছিলো ঘন ঘন। ধর্মঘট হলে গালর্স স্কুলের পিকেটিং করার দ্বায়িত্ব দেওয়া হতো সঞ্চিতাদের।

কলেজে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন সঞ্চিতা। ছাত্রদের অধিকার আদায় করতে নির্বাচনে মুখ্য ভুমিকায় ছিলেন তিনি। মেয়েদের নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে নির্বাচনি কাজ করেছেন এই নারী নেত্রী। তখন পাকিস্তানের শাসন চলছে। অভিভাবকরা মেয়েদের একা বাসা থেকে বের হতে দিতেন না। সঞ্চিতারা লুকিয়ে বের হতেন। কলেজ থেকেই মহিলা পরিষদের সাথে কাজ করছেন সঞ্চিতা। যুদ্ধের পর মহিলা পরিষদের কার্যক্রম তেমন একটা না থাকলেও বর্তমানে নারীদের জন্য কাজের দিক থেকে অনেকটাই সক্রীয় ভুমিকায় রয়েছে সংগঠনটি।

সঞ্চিতা মহিলা পরিষদের সহ সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর এর জেন্ডার কমিটির সভাপতি তিনি। এর বাইরেও জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সঞ্চিতা। এছাড়াও গালর্স গাইড এসোসিয়েশন এর সাধারণ সম্পাদক তিনি। সুনামগঞ্জ দুদক এর সেক্রেটারি, মহিলা সংস্থার সদস্য, জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠির সহ সভাপতি হিসেবে কাজ করে সফলতা দেখিয়েছেন এই নারী।

সঞ্চিতার প্রতিটা দিনের সকাল শুরু হয় কাজের মধ্য দিয়ে। নানা সংগঠনের নানা কাজের ভীড়ে তার সংসারের কাজ বলতে কিছুই নেই। তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের দিনটা হচ্ছে মৃত্যুর আগ মুহুর্তে মায়ের আকুতি থাকলেও মা কে একটাবার দেখতে না পারা। মা সুপ্রভা চৌধুরীর ফোনোকল তাকে ব্যাকুল করেছে কিন্তু মা তখন ভারতে ছিলেন। মায়ের আবদার রাখতে পারেনি সঞ্চিতা। মায়ের মুখ মনে হলেই কাাঁদেন অঝোরে।

সঞ্চিতার শখ বলতে সামাজিক কাজ। এর বাইরে তেমন কোন শখ নেই। সমাজের নারীদের প্রাপ্ত সম্মান আদায় করে দিতে পারাটা তার অন্যতম লক্ষ্য। অত্যাচারের শিকার নারীদের মুখে হাসি ফোটানোই তার জীবনের উদ্দেশ্য। আহামরি কোন স্বপ্ন নেই তাঁর। সমাজের মানুষরা যেন নারীদের ভালো একটা জায়গায় অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করে এবং যথাযথ সম্মান দেয় সেটা দেখতে চাওয়াটাই তার স্বপ্ন।

নারী হলেও সমানভাবে পুরুষের পাশাপাশি উদ্যোমী সঞ্চিতা চৌধুরী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের একজন পরিশ্রমী কর্মী হিসেবে তার কাজ তাকে ব্যাপক পরিচিত করেছে। যেখানেই নারীর প্রতি অবিচার আর সংসার ভাঙ্গার কথা উঠেছে সেখানেই ছুটেছেন সঞ্চিতা। স্থানীয়দের নিয়ে আলোচনায় শান্তি ফিরিয়েছেন। জোড়া লেগেছে সংসার। এখনো সংসার গড়ে দেয়ার কাজেই ছুটে চলেছেন সঞ্চিতা। মহিলা পরিষদের মাধ্যমে তার মতো অনেকে নারীর অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। তার কর্ম তাকে সম্মানিত করেছে এবং করছে প্রতিনিয়ত। ক্রীড়া ক্ষেত্রে এই নারী সিলেট বিভাগীয় মহিলা ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট থেকে সম্মানা স্মারক গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ফুটবল টুর্নামেন্ট, আন্ত:জেলা মহিলা এ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় সম্মাননা অর্জন করেন। নিরবে কাজ করে যাওয়া সঞ্চিতাকে উপকারভোগী নারীরা পরম স্বজন হিসেবে চেনেন।

সুনামগঞ্জ২৪.কম কে দেয়া সাক্ষাৎকারে সঞ্চিতা চৌধুরী বলেন ‘তৃর্ণমূল নারীদের নিয়ে আমি কাজ করতে পছন্দ করি, জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাই খবর পেলেই ছুটে যাই, অনেক স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের উপর অমানবিক অত্যাচার চালায়, সব ঠিক হয়ে যাবে ভেবে তারা এসব কথা কাউকে জানায় না, এমন অনেক দেখেছি, একটা সময়ে অত্যাচারের মাত্রা এতোটাই বেড়ে যায় যে বাঁচার জন্য তারা সাহায্য চায়, এমন খবরগুলো পাওয়ার পর আর এক মুহুর্ত ঘরে থাকা যায় না, নিজের যতোটা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে চাই তাদের সংসার টা তে আবার শান্তি ফিরে আসুক, কখনো তারা আবার হাসে, কখনো বা দুইটা জীবন আলাদা হয়ে যায়, কখনো মেয়েটা শান্তির আর সুখের দেখা পায়, একটা মেয়েকে বাঁচাতে পারার আনন্দ অনেক, যেটা আমি পাই, মহিলা পরিষদ আমাকে এই কাজ করতে পারার সুযোগ দিয়েছে বলে আমি খুশি, আমার জীবনে একটা নারীকে হাসতে দেখা অনেক বড় কিছু, নারীদের জীবনে প্রাণখোলা হাসির সুযোগ খুব কম হয়, আমি চাই তারা সব সময় হাসুক, বৈষম্য না থাকুক, তাদের প্রতি সমাজ মানবিক থাকুক, নারী হিসেবে আমরা সুযোগ চাই, নারী ঠিকই শ্রম দিয়ে এই সুযোগটা কাজে লাগাবে, তাদের পিছিয়ে রাখা অন্যায়’।

নিজের জীবনে সংসারে আবদ্ধ না হওয়া বিষয়ে তিনি বলেন ‘সবার জীবন নিয়েই ভাবতে চাই, নিজের জীবন নিয়ে যখন শুরু থেকে ভাবিনি তাই শেষ সময়ে এসেও কারো মুখে হাসি ফোটতে দেখেই আমি খুশি থাকতে চাই, সৃষ্টিকর্তার এই পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষও তো আছে যারা আমার মতোই একা থাকে, আমি তাদের সবাইকে নিয়ে তো একা নয়, সবার জীবনই যে একরকম হতে হবে এমন কোন কথা নেই, জমিদার পরিবারে জন্মেছি, বাড়ির প্রতিটা ছেলে- মেয়েকে মানুষ করেছি। মা- বাবাকে দেখাশোনা করা আর পরিবারের সবার সাথে থাকবো বলেই নিজের সংসার নিয়ে কখনও ভাবিনি’।

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ পিকেপি/ এমএআই

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™