সোমবার, ২৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জুলাই, ২০২০ ইং

রঙ্গালয়ের সাংস্কৃতিক উৎসব: মঞ্চপটে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশার বাংলাদেশ’

খবরটি শেয়ার করুন:

মনোয়ার চৌধুরী::

জীবনে সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নাম ছিলো স্বাধীনতা। এর জন্যেই তো কাস্তে- কোদাল ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রামের চাষিরাও হাতে ধরেছিলেন মেশিনগান। কতো নাম মুছে গেছে এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে গিয়ে। আজকের বাংলাদেশ কি তাদের কথা মনে রেখেছে? আদৌ কি যতোটা সম্মান পাওয়ার কথা তাদের তা দিতে পেরেছি আমরা? উল্টো সমাজে আজ তো দেখি তাদের আস্ফালনই বেশি, তারাই সুবিধা কেড়ে নিচ্ছে, হাক ডাক তাদের কম নয় যাদের পুর্ব পুরুষেরা ছিলো হায়েনাদের দালাল। মুক্তিযোদ্ধারা ও তাদের সন্তানেরা আজও ক্ষেতে খামারে কাজ করে খায়। নিজের গোয়ালের গরু চরালেও কপালে জোটে ‘২পয়সার রাখাল’ পরিচয়। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পর বাংলাদেশের এই সময়ে এসেও দাপট দেখাতে ভয় নেই রাজাকার সন্তানদের। বাংলাদেশের এমন বাস্তবতাকেই মঞ্চ নাটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অভিনয়ে।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়


সুনামগঞ্জের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘রঙ্গালয়’ তাদের ২য় বর্ষপূর্তি ও ৩য় বর্ষে পদার্পন উপলক্ষে আয়োজিত ৪দিন ব্যাপি নাট্য উৎসবের প্রথম দিনে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর হাসনরাজা মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এই নাটক মঞ্চায়নের সুযোগ করে দিয়েছিলো সিলেটের একঝাঁক প্রতিভাবান নাট্যশিল্পীদের। তাদের অসাধারণ অভিনয় দর্শকসারিতে যেনো ছড়িয়েছে মন্ত্রমুগ্ধতা। শব্দচয়ন আর রচিত নাটকের গল্পে মনযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলেন সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাট্য বিভাগের এই শিল্পীরা। তাই “বাঘের শিন্নি” নামের নাটকটি যেনো দর্শকদের নিয়ে গিয়েছিলো বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে।


গ্রাম্য সংস্কৃতির চলমান বিচার ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশপ্রেমী মানুষের সন্তানদেরকেও কাঠগড়ায় দাড় করানোর ক্ষমতা প্রদর্শন করে রাজাকার সন্তানদের আস্ফালন এই নাটকে তোলে ধরেছেন শিল্পীরা। অভিনয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশী আপামর সাধারণ মানুষের সাহসিকতার চিত্রও অভিনয়ে প্রকাশ পায়।


প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব ভবতোষ রায় বর্মণের রচনা ও নির্দেশনায় এই নাটকে রাজাকার সন্তানদের ক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি তাদের দাপটশালি অবস্থান ও সাধারণ বাঙ্গালীদের উপর আক্রমনাত্নক মনোভাবকেও অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলেন নাট্য শিল্পীরা। আর ১০জন বাঙ্গালীর মতো সাধারণ জীবনযাপনের বাইরে বিলাশিতায় ও চাকচিক্যে এখনো পাকিস্তানি দোসরদের সন্তানরা এই দেশেই প্রভাব খাটিয়ে চলার প্রবনতার কথা তোলে ধরা হয় নাটকে। তবে ঐক্যবদ্ধ সাহসি বাঙালীরা আওয়াজ তোললে ভীনদেশী এই দালালদের স্থান হয় জেলখানায়। এমন চিত্রই নাটকে মঞ্চায়িত হয়। তাদেরকে তুলনা করাহয় পশুর সঙ্গে। তাই চিড়িয়াখানা এবং জেলখানাকে পাশাপাশি সাজিয়ে প্রকাশ করেন “বাঘের শিন্নি” নাটকের শিল্পীরা।

এর আগে সন্ধ্যায় রঙ্গালয় আয়োজিত ৪দিনব্যাপি এই উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। ফানুস উড়িয়ে এই উদ্বোধনীপর্বে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ সভাপতি নুরুলহুদা মুকুট, জেলা সাংস্কৃতিক বিষয়ক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীনসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সুধীজনেরা।

আনুষ্ঠানিতায় ছিলো আলোচনাসভা, নৃত্যাঙ্গণের শিল্পীদের মনমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা, লোকগানসহ নানা পরিবেশনা। ১ম দিনের এই আয়োজন উপভোগ করতে সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গণের সকল স্তরের নানা বয়সিরা হাসনরাজা মিলনায়তনে সমবেত হয়েছিলেন।

এই উৎসবে অংশ নেয়া দর্শক রফিক আহমেদ চৌধুরী তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন ‘ যারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি তারা মাঠে-ঘাটে কাজ করে চলেছেন, তাদের সন্তানরাও আর ১০জনের মতো সাধারণ জীবন যাপন করে, কিন্তু এই দেশে রাজাকার সন্তানদের মতো প্রভাব খাটিয়ে চলতে পারেনা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা, যারা বাংলাদেশ চায়নি তাদেরকেই আমরা এখনো দেখি ভালো অবস্থানে রয়েছে, তারা হুংকার ছাড়ে, ক্ষমতার দাপদ দেখায়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষেরা যেনো কোন রকমে খেয়ে পরে বাঁচে, নাটকে অভিনয়ে আমি যেনো মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশার বাংলাদেশ দেখলাম, আমি আয়োজক ও নাট্য শিল্পিদের ধন্যবাদ জানাই’।

আরেক দর্শক ইয়াসমিন নাহার বলেন ‘ এমন আয়োজনগুলোতে নাটক মানুষের চোখ খুলে দেয়, বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে নাটকের রচনায় দারুণ মিল খুজে পেলাম, সত্যিই আয়োজনটি সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে’।

রঙ্গালয় সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন ‘ আজ প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিকতা ছিলো, ২৭, ২৮ ও ২৯ জানুয়ারিতেও আমাদের অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে, সর্বমোট ৫টি নাট্য সংগঠন এই উৎসবে নাটক পরিবেশনা করছেন, এর বাইরেও নৃত্য ও লোকসঙ্গীত তো থাকছেই, জেলা শিল্পকলা একাডেমী আমাদেরকে সহযোগিতা করছে, আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই যারা শ্রম দিয়ে পরামর্শ দিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করছেন এবং আহবান থাকবে এই অনুষ্ঠানে সমবেত হওয়ার’।

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ এমসি/ এমএআই

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন