শুক্রবার, ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

সরকারি কলেজের ৭৫বছর উদযাপনে বর্তমান শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টিও ভাবতে হবে

খবরটি শেয়ার করুন

সুনামগঞ্জ জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যতম ভুমিকায় থাকা বিদ্যাপীঠ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ। ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর জেলাবাসীর আশা-ভরসা, উচ্চ শিক্ষার অবলম্বন এই প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস বলছে, তৎকালীন আসামের প্রথম বেসরকারি বিজ্ঞান কলেজ এটি। আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর সহায়তায় ১৯৪৪ সালে এই কলেজে আই.এসসি কোর্স চালু হয়েছিলো। পরবর্তীতে বিজ্ঞান শিক্ষায় এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো সারা দেশে। দেশ বরেণ্য খ্যাতিমান ব্যাক্তিত্বদের অনেকেই এই কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং বিদেশেও অনেক ছাত্র তাদের প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন, এখনো অনেকে রয়েছেন দেশের গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্বে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্ব অব্দি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৪৪-১৯৪৭), পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর এর একাডেমিক দায়িত্ব অর্পিত হয়। পরবতীতে ১৯৬১ সালে ঢাকা বোর্ড ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পায়। ১৯৬২সালে কুমিল্লা বোর্ড এই দায়িত্ব পায়। ১৯৯৯ সালে সিলেট বোর্ড প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ সিলেট বোর্ডের অধীনে চলে যায়। এবং ডিগ্রী শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরে ১৯৯১-১৯৯২ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ন্যস্ত হয়।
১৯৪৪ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমার সাবডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) হিসেবে কর্মরত প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাই সৈয়দ মুর্তাজা আলী, জননেতারা পশ্চাদপদ ভাটি অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নেন এবং চাঁদা সংগ্রহে এগিয়ে আসেন। প্রথমে পঁচিশ হাজার টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে কলেজের মঞ্জুরীর জন্য কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়। প্রথমে স্থানীয় টাউন হলে কলেজের ক্লাস আরম্ভ হয়। ১৯৪৪ সালের শেষ ভাগে আসামের প্রধানমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ সাদ উল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে কলেজের দ্বার উদঘাটন করেছিলেন।

সুনামগঞ্জ কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ছাতকের প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী। কলেজের স্থান সংকুলানের জন্য স্বল্প পরিসর টাউন হলকে উত্তর দিকে সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯৬০ সালে কলেজ বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৯ সালে পুকুর খনন শুরু হয়। কলেজ টিনশেড একাডেমিক ভবনের উদ্বোধন হয় ১৯৬০ সালের ১৪মার্চ। ১৯৬১ সালে ২৮শে আগস্ট নতুন ভবনে ক্লাস শুরু হয়। ল্যাবরেটরি স্থানান্তরিত হতে বেশ সময় লেগেছিল। তাই ঐ সময় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের দুই স্থানেই ক্লাস নিতে হতো। ১৯৬২ সালে পুরাতন বিজ্ঞান ভবনের ভিত্তির কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালে পুরাতন বিজ্ঞান ভবনে কার্যক্রম শুরু হয় । ১৯৬৭ সালের দিকে পূর্ব দিকের টিনশেড অংশ তৈরি হয়। ১৯৬৭ সালে বি.এস-সি ও বি.কম কোর্স চালু করা হয়। অবশেষে ১৯৮০ সালের ৩রা মার্চ কলেজটি জাতীয়কৃত করা হয়। জাতীয় করণকালীন সময়ে তৎকালীন কলেজ গভর্ণিং বডি কর্তৃক ১৪/০৫/১৯৮০খ্রিঃ তারিখে সম্পাদিত ৮৫৮৫/১৯৮০নং দানকৃত দলিলের মাধ্যমে ২৫.৬৫ একর ভূমি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজকে প্রদান করা হয়। ১৯৯২-৯৩ সালে পুরাতন বিজ্ঞান ভবনের পেছনে ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের তত্ত্বাবধানে একটি দ্বিতল একাডেমিক ভবন তৈরি হয় যা পরবর্তীতে অনার্স ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৯৪-৯৫ সনে কলেজের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রস্তাবিত স্টাফ কোয়ার্টার এর পার্শ্বে একটি নতুন পুকুর খনন করা হয়। ১৯৯৩-৯৪ সনে নির্মিত হয় নতুন দ্বিতল বিজ্ঞান ভবন। ১৯৯৫-৯৬ সনের দুটি শ্রেণি কক্ষকে একটি স্থায়ী মঞ্চসহ ছয়’শ জন দর্শকের আসন সংবলিত মিনি অডিটরিয়ামে রূপান্তরিত হয়। ১৯৯৫ সালে কলেজ গেইট নির্মিত হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে কলেজ পুকুরের দক্ষিণ পার্শ্বের একটি টিনশেড ঘরে ক্যান্টিন স্থানান্তর হয়। কলেজের পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে একটি অস্থায়ী মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছিলো।

✅ বিজ্ঞাপন
cafeneio

এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন সকল শিক্ষার্থীরা আবারও প্রিয় কলেজ ক্যাম্পাসে ফিরতে চাইছেন। শিক্ষা জীবনের সোনালী অতিত কে মনে করে তারা গৌরবের ৭৫ বছর উপলক্ষে আয়োজন সাজিয়েছেন একটি পূনর্মিলনীর। নির্ধারিত তারিখে আয়োজনটি সম্পন্ন করার লক্ষে চলছে প্রচার প্রচারণা ও দফায় দফায় বৈঠকসহ প্রাক্তণ শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন। নির্ধারিত অঙ্কের টাকায় রশিদের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তণ ছাত্র ছাত্রীরা। আয়োজনকে উৎসবে রুপ দিতে পরিচালিত নানা কর্মসুচির মধ্যে চলছে আয়োজনকে ঘিরে নানা আলোচনা ও সমালোচনাও। এই আয়োজনে অংশ নিতে চাইছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ। তারা সম্প্রতি তাদের এই দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানিয়ে পালন করছেন নানা প্রতিবাদি কর্মসুচি। চলছে গণস্বাক্ষর। আন্দোলনরতদের দাবি এমন একটি উৎসব আয়োজন থেকে বঞ্চিত হতে চাননা তারা। অন্যদিকে, প্রাক্তণদের অভিমত আয়োজনটি নিয়ে বুঝার ভুল রয়েছে বর্তমান শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন যেহেতু এটি একটি পূনর্মিলনী অনুষ্ঠান সেহেতু যারা প্রাক্তন শিক্ষার্থী তারা আবার এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রিয় ক্যাম্পাসে সমবেত হবেন। উভয় পক্ষের এমন মনোভাব সাধারণ মানুষের মাঝে সৃষ্টি করেছে নানা প্রতিক্রীয়া।

এই আয়োজনটি যেহেতু জেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তাই আমাদের প্রত্যাশা আয়োজনকে ঘিরে থাকবে উৎসবের আবহ। সুন্দর পরিবেশ আর পরস্পরের প্রতি সহযোগি মনোভাব সুনামগঞ্জবাসীকে প্রত্যাশিত একটি আয়োজনের সাক্ষী করবে। তাই আয়োজকদের উচিত বর্তমান ছাত্রদের এমন দাবিগুলোর বিষয়ে সকলে সমবেত বৈঠকের মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনা করা। যদিও এটি সম্পর্কে প্রাক্তন ছাত্ররা ভালো জ্ঞান রাখেন এবং যোগ্যতার দিক থেকে তারা এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে করি আয়োজনটি সফল করে তোলতে বর্তমান শিক্ষার্থীদেরও একেবারেই বাদ দেয়া যায়না। তারাও এই আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতা করতে পারে নানা দিক থেকে। তাদের বর্তমান কর্মসুচিগুলোতে পরিলক্ষিত হয় তাদের নিরবে ক্ষুব্ধতার কথা। আয়োজনের নিকটবর্তী সময়ে এই চাপা ক্ষোভ প্রকাশ্য বিরোধিতায় রুপ নিতে পারে বলেও মনে করছি। কলেজ প্রশাসনেরও এখানে দায়িত্বশীলতার প্রমাণ রাখতে হবে। আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যদি যৌক্তিক হয়ে থাকে তাহলে আয়োজকদের সঙ্গে আবারও তাদের সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। লিখিতভাবে নিজেদের দাবির কথা তোলে ধরে আবেদন করা যেতেও পারে। একটি সুন্দর আয়োজনের পরিবেশ তৈরী করে দেয়া অবশ্যই বর্তমান শিক্ষার্থীদের দায়িত্বের মধ্যে পরে যেহেতু তারা এই প্রতিষ্ঠানের গর্বিত শিক্ষার্থী। আশা করি “পক্ষে” “বিপক্ষে” বলে কোন কথা না রেখে ‘সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ’ টা কে বড় করে দেখবেন সকলে। একটা সুন্দর আয়োজন এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আপনার ভালোলাগার গল্পে আরও একটা লাইন যুক্ত করবে। গর্বিত করবে আপনাকেও। অগ্রজ ও অনুজদের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে এই আলোচনা সমালোচনার ইতি টানতে হবে। স্থাপন করতে হবে দৃষ্টান্ত। আয়োজন নিয়ে বিরোধ নয়, থাকতে হবে সকলের সহযোগি মনোভাব। গোটা বিশ্ব ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুনামগঞ্জবাসী এটাই প্রত্যাশা করেন।
– মো. আমিনুল ইসলাম।

✅ বিজ্ঞাপন
coffeclub

খবরটি শেয়ার করুন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন