বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

আমি পিছিয়ে যাইনি, নারী হলেও আমার স্বপ্ন ছোট নয়

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রিয়াঙ্কা কর, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

শুরুতে অনেকেই বলেছিলেন ‘পুরুষরাও ধাক্কার মতো খেয়েছেন। ব্যবসায় দিনকাল ভালো না। আগের মতো ক্রেতা নেই।’ অনেক কথার ভয় কে উড়িয়ে দিয়ে সাহস রেখেছিলেন নিষাদ। হার না মানা একজন নারী উদ্যোক্তা তিনি। জেলা শহরের মধ্যবাজার এলাকায় আর দশটা পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মতোই ক্রেতাদের সমাগম ঘটে নিষাদের প্রতিষ্ঠানে। ‘রঙ্গণ ফ্যাশন হাউজ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন নিষাদ রহমান। নারীমঞ্চ’র সাক্ষাৎকারে প্রতিবেদকের সঙ্গে অনেকটাই আত্মতৃপ্তি নিয়ে বখা বলেছেন এই নারী উদ্যোক্তা। sunamganj24.com -এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদক ও নিষাদ রহমানের আলাপচারিতা তোলে ধরা হলো।

প্রতিবেদক: কেমন আছেন?

নিষাদ রহমান: হ্যা, ভালোই আছি।
প্রতিবেদক: কেমন চলছে রঙ্গণ?
নিষাদ রহমান: ক্রেতাদের কাছে পৌছে যেতে পেরেছি, তারাই এখন চালাচ্ছেন, নিয়মিত ভালোই ক্রেতাদের দেখা পাই।

প্রতিবেদক: ব্যবসায় কিভাবে এলেন?
নিষাদ রহমান: আমি একজন নারী হিসেবে শুধু গৃহস্থলীর কাজ করার পর বাকী সময় বসে থাকতাম। তাই আমার মনে হলো এই অবসর সময়টুকু যদি কোন আয়মূলক কাজে লাগাতে পারি তাহলে আমার সংসারকেও আর্থিক ভাবে সহায়তা করতে পারবো। সেই সাথে আমি কিছু একটা করছি এটাও আমার মনের তৃপ্তি আসবে। সেই চিন্তা করেই দোকানটি শুরু করি। আসলে এটা আমার স্বপ্ন ছিল না, এটা আমার চাহিদা ছিল। তবে এখন এই প্রতিষ্ঠানটি আমাকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে, প্রথমে ভয় ছিলো, তবে আমি পিছিয়ে যাইনি, আর এখনও থমকে যাওয়ার মতো নয়, নারী হলেও আমার স্বপ্ন ছোট নয়।

প্রতিবেদক: আপনি যখন ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন তখন আপনার পাশে কে কে ছিল? আপনার স্বামীর পরিবার বা আপনার বাবার পরিবার থেকে কতোটা সাপোর্ট পেয়েছেন?
নিষাদ রহমান: এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নটা ছিলো আমার ও আমার স্বামীর। প্রতিদিন বিকালে তার মোটরসাইকেলে করে ঘুরতাম, আমরা দু’জন মিলে ব্যবসার বিভিন্ন পরিকল্পনা করতাম। আর আমার বাবার পরিবার থেকে কখনও বাঁধা দেয়নি। তবে আমার বড় ভাই শামীম আমাকে খুব সহযোগীতা করেছে ও উৎসাহ যুগিয়েছে। সাথে আমার দেবর নুরনবী আমাকে সহযোগীতা করেছে।

প্রতিবেদক: আপনি ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেন কত সালে এবং আপনার পরিকল্পনাটি সফল হয়েছিল কত সালে?
নিষাদ রহমান: আমি ২০১৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যবসা শুরু করার চিন্তা করি। তবে আমি এই ব্যবসা শুরু করার পূর্বেও আমার একটা পার্লার ছিল। যেটা আমি আমার বাসা থেকে শুরু করি। প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে আমার মনে ব্যবসার চিন্তা আসে। তাই আমি ২০১৫ সালে এই ব্যবসা শুরু করি।

প্রতিবেদক: আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা কতো?
নিষাদ রহমান: আমি, আমার স্বামী এবং আমাদের ১জন মেয়ে আছে। তবে আমার শ্বশুর-শ্বশুড়ী, দেবর আছে। আমার মা-বাবা বেঁচে নেই। আমার দুই ভাই ও দুই বোন আছে। তবে খুব মনেপরে আমার সেলিম ভাইকে। সে বেঁচে নেই। সে থাকলে আজ খুব খুশি হত। আমাদের সবার বড় বোনও অনেক আগেই মারা গেছেন। আসলে এরা সবাই আমার পরিবারের সদস্য এবং আমার স্বপ্ন দেখার উৎসাহ।

প্রতিবেদক: আপনার স্বামীর কতোটা সাপোর্ট ছিলো এই উদ্যোগে?
নিষাদ রহমান: আমার স্বামীর সাপোর্ট আমি সবচেয়ে বেশী পেয়েছি, তার নাম মোঃ কামরুজ্জামান, সে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রকল্প সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ব্যবসা শুরু করার সময় অনেকে অনেকভাবে ভয় দেখালেও সে সব সময় আমার পাশে ছিলো।

প্রতিবেদক: আপনার সন্তানদের নিয়ে কতোটা ভাবেন? তাদের নিয়ে স্বপ্ন কি?
নিষাদ রহমান: সকল মায়েরাই তাদের সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, আমাদের ১টি মেয়ে আছে। তার নাম কামরুন নাবিহা তাহসিন, তাকে আমরা নুবাহ বলে ডাকি, আমাদের মেয়ে ২য় শ্রেণিতে পড়ালেখা করে, সারাদিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তার জন্য আমার আলাদা করে সময় বের করা আছে, ব্যবসার পাশাপাশি সংসার টাও আমি স্বাভাবিকভাবেই চালাই।

প্রতিবেদক: আপনি ব্যবসা কিভাবে পরিচালনা করেন?

নিষাদ রহমান: আমি মূলতো ঢাকা থেকে দোকানের মালামাল ক্রয় করি। আমি নিজেও যাই মালামাল ক্রয় করার জন্য। তবে যেহেতু যুগ এগিয়ে গেছে। এখন ইমো বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মালামাল দেখে ক্রয় করা যায়। ইন্টারনেট আমার ব্যবসা পরিচালনায় বড় একটি ভুমিকা পালন করছে, ব্যবসা এখন আরো সহজ হয়ে উঠেছে। আমি ২০১৫সাল থেকে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি শুরু করার পর থেকে এখনো ভালোই চালাচ্ছি।

প্রতিবেদক: এই ব্যবসা চালু করার আগে আপনি কি করতেন?
নিষাদ রহমান: এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালুর আগে আমি শুধুই একজন গৃহিনী ছিলাম। একসময় আমাদের অনেক অভাব ছিল, আমার স্বামী একজন ভালো মানুষ, অভাবের দিনগুলোতে সে যেমন ছিল এখনও সে তেমনই আছে। আসলে দুঃখ বলতে আমাদের সমাজে নারীরা এখনও কোন কিছু করতে চাইলে সমাজের বিভিন্ন বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়। আমি একমাত্র নারী হিসেবে সুনামগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে যখন এই প্রতিষ্ঠানটি শুরু করি, তখন অনেক প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। কিন্তু আমি পিছিয়ে যাইনি। আমার স্বামী আমাকে সাহস যুগিয়েছে। কোন ঝামেলা হলে সে তা সুন্দর সমাধানের পথ বলে দিয়েছে। তবে এখন আমি নিজেই আমার সমস্যা সমাধান করতে পারি। তবে আমাদের সমাজের নারীদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

প্রতিবেদক: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

নিষাদ রহমান: আমি জেলার একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গর্বিত। আমি বলতে পারি শূণ্য হাতে এই ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখানে মেধা ও শ্রম দিয়েছি। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে আমি একসময় প্রোডাকশনে যাবো। অর্থের অপ্রতুলতার কারনে এখনই এই চিন্তা করছি না। তবে পরিকল্পনা আছে আমি নারীদের নিয়ে মিনি গার্মেন্ট’স প্রতিষ্ঠা করবো। আসলে আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো তো আমাদের মত ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের বড় ঋণ দেয় না। নারীদের জন্য ঋণ দেয়ার ঘোষণা থাকলেও তারা তা সঠিকভাবে মানে না। সরকারের দায়িত্বশীলদেরকে এইগুলো পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী তাদেরকে যদি আয়মূলক কাজে লাগানো যায়। দেশের উন্নয়নে সময় লাগবে না। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিই আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

প্রতিবেদক: অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
নিষাদ রহমান: ধন্যবাদ সুনামগঞ্জ২৪.কম কে।

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™