বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

আমি নারী, সফলতা আমারও কম নয় – তুলনা আনাস

নিউজটি শেয়ার করুন


নাজরিন জাহান, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

লুবাবা মাইশা কবির | ডাক নাম তুলনা। ৬বছর বয়সি মেয়ে আদ্রিনা আর ২বছর বয়সি আলবিনাকে নিয়ে সংসারের যতো স্বপ্ন তার। স্বামী আহসান জামিল আনাস কণ্ঠশিল্পী। আর দশজন নারীর মতোই তুলনার সংসারে ব্যস্ততা আছে প্রতি মুহুর্তে। তবে কিছু স্বপ্ন তাকে প্রেরণা দিয়েছে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে সামনে এগিয়ে নেয়ার। সুনামগঞ্জ জেলা শহরে ‘তুলনা আনাস’ নামেই সবচেয়ে পরিচিত তিনি। শহরের তেঘরিয়া এলাকায় বসবাস করেন তুলনা। শিক্ষাজীবনের গন্ডি পেরিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন আহসান জামিল আনাসের সঙ্গে। তার বাবার নাম মরহুম অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবির জাহানুর। শহরের ষোলঘর এলাকায় বাবার বাসায় প্রায়ই সময় কাটান তুলনা।

ছোটবেলা থেকেই রান্না শেখার ইচ্ছে তাকে মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে এটা ওটা করে সময় কাটাতে সাচ্ছন্দ এনে দিতো। প্রতিনিয়ত শেখার ইচ্ছে থেকেই মায়ের কাছে কেক বানানো শেখা। আর তার বানানো কেক এখন জেলা শহরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। প্রায় প্রতিদিনই দারুণসব ডিজাইনের কেক অর্ডার অনুযায়ি তৈরী ও বিক্রয় করছেন তিনি। আর এর পুরো মার্কেটিং ব্যবস্থাই অনলাইন নির্ভর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে তুলনা তার গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্ডার নিচ্ছেন। নির্দৃষ্ট সময়ে এসব কেক গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করছেন তিনি। বাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কেক নির্দৃৃষ্ট কয়েকটি ডিজাইনের মধ্যে অর্ডার করতে হলেও তুলনা আনাস গ্রাহকদের পছন্দ অনুসারে যে কোন ডিজাইনে কেক তৈরী করতে পারায় প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে তার গ্রাহকের সংখ্যা।

এমন সফলতার গল্প জানতে সুনামগঞ্জ২৪.কম এর নারীমঞ্চ প্রতিবেদক কথা বলেছিলেন সফল এই নারী উদ্যোক্তা লুবাবা মাইশা কবির তুলনা’র সঙ্গে। পাঠকদের জন্য তাদের আলাপচারিতা তোলে ধরা হলো-


প্রতিবেদক: শুভেচ্ছা আপনাকে, কেমন আছেন?

তুলনা আনাস: আপনাকেও স্বাগতম, আমি ভালোই আছি।

প্রতিবেদক: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই দেখি আপনার তৈরী কেক নিয়ে আলোচনা,কিভাবে আপনি কেক সরবরাহ করেন?
তুলনা আনাস: আমি ফেসবুক ব্যবহার শুরু করেছিলাম ২০০৯সাল থেকে, আমি অনলাইন শপ নিয়ে অনেক ভেবেছি, আমার স্বপ্ন ছিলো কিছু একটা করার, কিন্তু মেয়ে হওয়াতে চাইলেই হুট করে কিছু করা সম্ভব নয়, এখানকার সামাজিকতা পুরুষদের জন্য সুবিধা যতোটা দেয় নারীদের জন্য ততোটা নয়, তাই ফেসবুক কে ব্যবহার করেই কিছু করতে চাওয়া, আমার কেকগুলো ফেসবুক পেজ এর মাধ্যমেই অর্ডার অনুযায়ি সরবরাহ হয়।

প্রতিবেদক: কবে থেকে কিভাবে কেক বানানো শুরু করলেন?
তুলনা আনাস: আসলে আমি মায়ের কাছে শিখেছি, মায়ের সঙ্গে সব সময় রান্না-বান্না শেখার ইচ্ছে থেকে রান্নাঘরে ঘুরঘুর করতাম, মা আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছেন, এরমধ্যে কেক টা অন্যতম, কয়েক বছর আগে কেক বানানো শিখেছি’।

প্রতিবেদক: আপনার সংসার জীবন ও এই অনলাইন নির্ভর ব্যবসা দুটোই সামলে নেওয়াতে সহযোগীতা পাচ্ছেন কতোটা?
তুলনা আনাস: আমার সংসারে ৭জন সদস্য। দুই মেয়ে, স্বামী, দেবর, শশুর- শাশুড়িকে নিয়ে সংসারের কাজগুলোতে তেমন চাপ নেই, সবাই সবাইকে আমরা সহযোগিতা করি, সকাল সাড়ে ৮টায় মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, মেয়ে আমার নার্সারি ২ তে পড়ে, সাড়ে ১০টায় ওকে নিয়ে ফিরে আসা, এরপর কেক এর অর্ডার নিয়ে দুপুর অব্দি কাজ করি, পরে আবার সংসারের কাজগুলোতে নজর দিতে হয়, আমার মা শিউলি কবির আমাকে অনেক সাপোর্ট করেন, সব কাজেই আমি আমার স্বামী ও পরিবারের সহযোগিতা পাই’।


প্রতিবেদক: আপনি কেক তৈরি ও অনলাইনে বিক্রি কবে থেকে শুরু করেছিলেন?

তুলনা আনাস: সেটা খুব বেশীদিন নয়, আমি অনলাইনে অর্ডার রাখার জন্য চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তুলনা’স নামের একটি ফেসবুক পেজ ওপেন করি, এর আগে আমি পরিচিতদের জন্য কেক তৈরী করে দিতাম।

প্রতিবেদক: এখন অব্দি কতো সংখ্যক কেক তৈরী ও সরবরাহ করেছেন?
তুলনা আনাস: এরকম হিসেব কখনো করিনি, তবে একটু বড় ও আকর্ষনীয় দেখতে ১৮০টিরও বেশী কেক আমি গ্রাহকদের কাছে অর্ডার অনুযায়ি সরবরাহ করেছি।

প্রতিবেদক: বাজারের কেক এর চেয়ে গ্রাহকরা আপনার তৈরী কেক কেনো ক্রয় করতে আগ্রহ দেখান?
তুলনা আনাস: আমি লাভের চেয়ে কেক এর কোয়ালিটি টা বজায় রাখার চেষ্টা করি, হয়তো বাজারের কেক এর চেয়ে আমার তৈরী কেকগুলোর মূল্য একটু বেশি কিন্তু আমার এসব কেক এ কোন ক্ষতিকারক ক্যামিক্যাল ব্যবহার করিনা, ডালডা দিয়ে আমি কেক বানাই না, বাজারের দোকানগুলো চায় অধিক লাভ, তাই তারা গ্রাহকদেরকে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়, আমার তৈরি কেক যারা নিয়েছেন তারা আমার মনেহয় আর কখনো বাজারের কেক কিনতে আগ্রহী না’।

প্রতিবেদক: আপনি কি কি উপাদান ব্যবহার করেন কেক তৈরীতে?
তুলনা আনাস:: আমি প্রতিটি কেক তৈরীতে ভোজ্য তেল, ডিম, ময়দা, চিনি, বাটার, গুড়ো দুধ, এসেন্স, ফুড কালার, বেকিং পাউডার ব্যবহার করি। আমার প্রতিটি কেক তৈরীতে ২ থেকে আড়াই ঘন্টা সময় লাগে।

প্রতিবেদক: শুরু থেকে এখন অব্দি অনলাইন নির্ভর এই ব্যবসায় আপনার আয় কতো?
তুলনা আনাস: আমার এই ব্যবসায় আমি বেশীদিন হয়নি এসেছি, তবে শুরু থেকে আজ অব্দি আমি যতো কেক বানিয়েছি তাতে আমি ১লক্ষ ৫৩ হাজার টাকা আয় করেছি, আমি মনেকরি সংসারে কেবল পুরুষের উপর নির্ভরতা বাড়িয়ে না দিয়ে নারীরাও কিছু করা উচিৎ, নারী বলে পিছিয়ে থাকবো কেনো? আমি নারী, সফলতা আমারও কম নয়, অবসর সময়ে নারীরা চাইলেই ঘরে বসে এমন কিছু করতে পারেন’।

প্রতিবেদক: আপনি কি একাই উপকরণ সংগ্রহ করেন?
তুলনা আনাস: হ্যা আমি কখনো কখনো করি, তবে আমি ৫জন নারীকে নিয়ে একটি টিম তৈরী করেছি, এই টিমের একজন নিয়মিত উপকরণ সংগ্রহ করতে বাজারে যান, বাকি সদস্যরা কেক তৈরীতে আমাকে সহযোগীতা করছে, তাদেরকে আমি শিখিয়ে দিচ্ছি, একবার দেখিয়ে দেয়ার পর তারা নিজেরা চেষ্টা করছে, এতে আমার কাজের প্রক্রীয়া টা সহজ হচ্ছে, তবে আমি নিজে কেকগুলো ডিজাইন করি’।

প্রতিবেদক: এখন কেক তৈরী ও সরবরাহে ব্যস্ততা কেমন?
তুলনা আনাস: আগে সপ্তাহে ১ টা বা দুইটা অর্ডার পেতাম, এখন প্রতি সপ্তাহে কম পেলেও সপ্তাহে ১০টা থেকে ১২টা কেক তৈরীর অর্ডার পাই, সে দিক থেকে ব্যস্ততা কিছুটা অবশ্যই বেড়েছে, বর্তমানে আমি চকোলেট কেক, কাপ কেক, নরমাল কেকসহ কয়েক ধরণের কেক তৈরী করছি, ভবিশ্যতে আরও কিছু ভিন্নতা আনার চেষ্টা করছি, আরও কিছু আইটেম থাকবে , অর্ডার অনুযায়ি গ্রাহকদের সরবরাহ করবো সেগুলোও’।

প্রতিবেদক: এই ব্যবসার পাশাপাশি আর কিছু নিয়ে ভাবছেন কি না?
তুলনা আনাস: আমি আমার পারিবারিক কাজের বাইরে এই ব্যসা টা শখের বসেই শুরু করেছিলাম, এটার বাইরে আমি আমার মায়ের একটা বুটিকস্ হাউজ নিয়ে কাজ করি, কেক তৈরীর উদ্যোগ নেয়ার সময় আমাকে অনেকেই অনেকভাবে আশাহত করেছিলেন, কেউ কেউ সমালোচনাও করেছেন, তুলনা’স যখন ওপেন করি তখন বিচিত্র অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, তবু থেমে যাইনি, আমি জানি প্রচেষ্টা আমাকে সফলতার মুখ দেখাবেই’।

প্রতিবেদক: তুলনা’স নিয়ে আপনার ভবিশ্যত পরিকল্পনা কি?
তুলনা আনাস: প্রত্যেক মানুষেরই কিছু স্বপ্ন থাকে, আমারও আছে, আমি চাই শহরে তুলনা’স এর একটা শো-রুম থাকুক, যেখানে গ্রাহকরা তাদের অর্ডার অনুযায়ি দারুণসব কেক সংগ্রহ করতে পারবেন, আমার এই শো- রুম এই শহরের নারীদের উৎসাহিত করবে বলেও আমি মনে করি, আর ১০টা পুরুষ পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ভীড়ে ব্যস্ততম এলাকায় একটা নারী উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের সেবা দেবে সেটা দেখতে পারাটাও ভালো লাগার’।

প্রতিবেদক: আপনার সে স্বপ্ন পুরণের প্রত্যাশাই করি, আপনাকে ধন্যবাদ।
তুলনা আনাস: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ, সুনামগঞ্জ২৪.কম এর সকল কে আবারও শুভেচ্ছা।

পাঠকদের জন্য এই নারী উদ্যোক্তার ফেসবুক পেজটির লিংক দেয়া হলো- এখানে ক্লিক করুন
আপনিও অর্ডার করতে পারেন ইচ্ছেখুশি ব্যতিক্রমী সব কেক।

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™