বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

নারী বলে ঘরে বসে থাকিনি, সুই সুতোর কারুকাজে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছি – ইমা

নিউজটি শেয়ার করুন


প্রিয়াঙ্কা কর, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

সৈয়দা ফারহানা ইমা। শহরে ‘ইমা আপা’ নামে পরিচিত তিনি। শহরের ব্যস্ততম এলাকা কালীবাড়িতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এই নারী। নারীদের পাশাপাশি পুরুষের রুচীশিল পাঞ্জাবীর কালেকশন রয়েছে ইমার এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। সাতরং বুটিক’স এন্ড লেডিস টেইলার’স নামে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন তিনি। নারী হলেও সংসারের শত ব্যস্ততার পাশে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততাও সামলে নিচ্ছেন সমানতালে। তার স্বামীর নাম মো. লুতফুর রহমান। পরিবারে ৫ সদস্যের মধ্যে ৯বছর বয়সি ছেলে তাওসিফ রহমান সিয়াম ও ৬ বছর বয়সি তাসনিয়া রহমান সায়বা কে নিয়ে যতো স্বপ্ন ইমার।

মায়ের কাছ থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি হাতের কাজটা শিখেছিলেন ইমা। মায়ের ইচ্ছে ছিলো সুই- সুতোর কারুকাজ নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান সবাইকে সেবা দিক। এতে নিজেদেরও একটা আয়ের উৎস হবে। পাশাপাশি হবে আরও কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু সে সময়ে সামাজিকতা নারীদের জন্য অনেকটাই স্বপ্নের পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাড়াতো। “লোকে কি বলবে?” এমন কথাই আটকে দিতো নারীর এক একটা উদ্যোগ কে। মায়ের স্বপ্ন নারী হলেও পুরণ করেছেন ইমা। সব বাধার প্রাচির ভেঙ্গেই আর ১০টা পুরুষ পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভীড়ে ইমা’র সাতরং বুটিকস এখন সুনামগঞ্জ শহরের জনপ্রিয় এক পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

সফলতা অর্জনকারী এই নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে কথাহয় সুনামগঞ্জ২৪.কম এর নারীমঞ্চ প্রতিবেদকের। এসময় ব্যবসার পাশাপাশি নিজের সংসার জীবনের অনেক গল্পই উঠে আসে সৈয়দা ফারহানা ইমার বক্তব্যে। পাঠকদের জন্য প্রতিবেদকের সঙ্গে এই নারী উদ্যোক্তার কথোপকথন তোলে ধরা হলো-

প্রতিবেদক- শুভেচ্ছা আপা।
ইমা- আপনাকেও সাতরং বুটিক’স এ স্বাগত।

প্রতিবেদক- কেমন চলছে সাতরং বুটিক’স?
ইমা- গ্রাহকদের অর্ডার পাচ্ছি ভালোই, দিন দিন গ্রাহকরা সংখ্যায় বাড়ছেন, তাদের পছন্দমতো অর্ডার করছেন এবং আমরা তাদের পছন্দ অনুযায়ি সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

প্রতিবেদক- কবে থেকে ব্যবসায় আসলেন?
ইমা- আমি আসলে কলেজে লেখাপড়া করার পাশাপাশি মায়ের কাছে শিখতাম, এরপর ২০১১ সালের ১জুন থেকে এই প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো শহরের নতুনপাড়া এলাকায় যাত্রা শুরু করে, এরপর ৩মাসের মতো পারিবারিক একটা কারনে একটু বিরতি দিয়ে আবারও পুরোদমে ব্যবসায় মনোযোগ দেই।

প্রতিবেদক- আপনি কি ধরণের কাজ করেন?
ইমা- সাতরং বুটিকস এন্ড লেডিস টেইলার্স মুলতো নারী ও পুরুষদের পোশাক তৈরী করে থাকে, এরমধ্যে কিছু কাজ আছে যেমন- এম্বুশ, ব্লক, এমব্রয়ডারি, কাটাস্টিক, এসব কাজ করাহয় পোশাকে। অনলাইনে Emagin নামে একটা ফেসবুক পেজ এর মাধ্যমে আমি আমার পোশাক দুর দুরান্তের গ্রাহকদের কাছেও পৌছে দিচ্ছি। গ্রাহকরা পেজ এ অর্ডার করেও সেবা পাচ্ছেন।

প্রতিবেদক-আপনি ব্যবসায় উদ্যোগ কিভাবে বা কেনো নিলেন?
ইমা- আসলে আমি ২০০৮ সালে অনার্স শেষ করি, চাকরির প্রতি কখনোই আমার চিন্তা ভাবনা বা ইচ্ছে ছিলো না, নিজে কিছু করার চেষ্টা থেকেই মুলতো ব্যবসায় আসা, আমার বিয়ে হয় ২০০৭ সালে, এর পর স্বামীর কাছে আমি নিজের ইচ্ছেটার কথা শেয়ার করেছিলাম, সে আমাকে সাপোর্ট করেছে, এরপর ২০১১ সালে ব্যবসা টা শুরু করা।

প্রতিবেদক- কালীবাড়ি এলাকায় ব্যবসার শুরু টা কেমন ছিলো?
ইমা- আসলে নারী হিসেবে মানুষ প্রথমে একটু অবাক হতো, আমি ব্যবসা করছি এটা যেনো অনেকের কাছেই একটু অন্যরকম লাগতো, কালীবাড়িতে ২০১২ সালে আমি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করি, প্রথম প্রথম আমার গ্রাহক কম ছিলো, দিন দিন ভালোই সাড়া পেতে থাকি, হাতের কাজ টা মানুষের কাছে ভালো লাগতে থাকে।

প্রতিবেদক- সবচেয়ে বেশী গ্রাহক কোন বয়সি?
ইমা- তরুণীরাই সবচেয়ে বেশী অর্ডার রাখেন, তবে তরুণরা পাঞ্জাবীর জন্য বিভিন্ন উৎসবে আমার কাছে অর্ডার রাখতে আসেন, এছাড়াও বিভিন্ন স্কুল- কলেজের পোশাক তৈরীর জন্যও আমার প্রতিষ্ঠানে অর্ডার রাখা হয়।

প্রতিবেদক- প্রতি মাসে কেমন পোশাক তৈরী ও সরবরাহ করতে পারছেন?
ইমা- প্রতি মাসে আমি ৩০ থেকে ৪০হাজার টাকার পোশাক গ্রাহকদের কাছে পৌছে দিতে পারছি, তাছাড়া প্রতি ঈদে কেবলমাত্র দেশের বাইরেই আমি কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকার পোশাক রপ্তানি করতে পারছি, অনলাইনে প্রবাসী বাংলাদেশীরা অমার এই প্রতিষ্ঠানে পছন্দ অনুযায়ি সুই সুতার কারুকাজে পোশাক তৈরী করে দেয়ার অর্ডার রাখছেন।

প্রতিবেদক- আপনার প্রতিষ্ঠানে তৈরী পোশাকের দাম কি নাগালের মধ্যে?
ইমা- হ্যা, মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সবার জন্যই আমি পোশাক তৈরী করছি, আমার প্রতিষ্ঠানে ১৫জন কর্মী নিয়মিত যে পোশাকগুলো তৈরী করছেন সেগুলো সর্বনি¤œ ১হাজার৫শ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা অব্দি দামে আমি বিক্রি করছি’।

প্রতিবেদক- এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আপনার স্বপ্ন কি?
ইমা- আমি চাই আমার ফেসবুক পেজ টা তে যেভাবে অসংখ্য গ্রাহক অর্ডার রাখছেন এটির নামে শহরে একটি শো-রুম করি, এই প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকরা আরও বেশী অর্ডার রাখলে এর সঙ্গে সম্পৃক্তরা আরও বেশী উৎসাহ পাবে’।

প্রতিবেদক- নারীদের প্রতি আপনার কোন আহবান আছে কি?
ইমা- হ্যা, অবশ্যই আছে, আমি একজন নারী হয়েও এগিয়ে চলেছি, প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে কিন্তু এর মানে এই নয় যে নারী হলেই ঘরে বসে থাকতে হবে, আমি নারী বলে ঘরে বসে থাকিনি, সুই সুতোর কারুকাজে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছি, তাই যতোটা সম্ভব কাজে লেগে যেতে হবে, নারী হিসেবে সংসারের হাল ধরাটা খারাপ কিছু নয় বরং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থানের দিকে নারীকেও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, তাহলে আসবে সমৃদ্ধি, সমাজে নারীকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই, কারণ নারীরা আত্মপ্রত্যয়ি’।

প্রতিবেদক- অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে, সুনামগঞ্জ২৪.কম আপনার প্রতিষ্ঠানের আরও উন্নতি কামনা করছে।
ইমা- আপনাকেও ধন্যবাদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™