বৃহস্পতিবার, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জুন, ২০২০ ইং

দরিদ্র তালিকায় প্রবাসী-মৃত-সচ্ছল ও সুবিধাভোগীদের নাম: কিছুই জানেন না উপজেলা চেয়ারম্যান

খবরটি শেয়ার করুন:

আশিস রহমান ::

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২০ সালের চলতি বছরের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতাধীন দোয়ারাবাজার উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে হতদরিদ্রদের তালিকা প্রকাশ করেছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই তালিকায় উপজেলার সবকটি ইউনিয়নের হতদরিদ্রের নাম প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু খাদ্যবান্ধব তালিকায় হতদরিদ্রদের নামের বদলে স্থান পেয়েছে অনেক স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরা। তালিকায় রয়েছে একই পরিবারের একাধিক মৃত সদস্যসহ দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীদের নামও। এছাড়া একাধিক সুবিধাভোগীদের নামও স্থান পেয়েছে এই তালিকায়। প্রকৃত হতদরিদ্রদের নাম বাদ পরলেও বাদ যায়নি স্বচ্ছল সরকারি চাকুরিজীবী পরিবারের সদস্যদের নাম। এই তালিকা দেখে হতাশ হয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র পরিবারের লোকজনসহ উপজেলার সচেতন মহল।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

এ তালিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সুনামগঞ্জ২৪.কম এর অনুসন্ধান বলছে, উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের (আলীপুর, হাছানবাহার, বৈঠাখাই) তালিকায় ৪৬৮ নং ক্রমিকে স্থান পেয়েছে প্রবাসী নুরুল ইসলামের নাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার এক সন্তান সরকারি চাকুরিজীবী। ৪৭০ নং ক্রমিকে নাম থাকা গৃহিণী রাজিয়া খাতুনের দুই সন্তান সরকারি চাকুরিজীবী এবং তার পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তবে যোগাযোগ করা হলে রাজিয়া খাতুনের ছেলে সরকারি চাকুরিজীবী লোকমান হোসেন বলেন, ‘তালিকায় কিভাবে আমার মায়ের নাম এলো তা আমরা জানিনা। নাম দেখে আমি নিজেও অবাক হয়েছি।’

অনুসন্ধানে সুনামগঞ্জ২৪.কম প্রতিবেদক ৭ নং ওয়ার্ডের তালিকায় নাম থাকা অন্যান্যদের তিন-চতুর্থাংশই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং কর্মক্ষম ব্যক্তিদের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। একই ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের (খাগুরা, বরকতনগর, জিয়াপুর, গোজাউরা) তালিকায় ৬৪২ নং ক্রমিকে এসেছে ভাতাপ্রাপ্ত এক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিমের নাম। একই তালিকায় ৬৫২ নং ক্রমিকে তার মৃত স্ত্রী আমেনা বেগমের নামও এসেছে এই তালিকায়। শুধু মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম ও তার মৃত স্ত্রী আমেনা বেগমের নাম হতদরিদ্রের তালিকায় অন্তভুর্ক্ত হয়েই শেষ হয়নি। আমেনা বেগমের পরের ক্রমানুসারে ৬৫৩ নং ক্রমিকে এসেছে তাদের সন্তান মোঃ ফরিদ মিয়ার নাম। তিনিও একাধিক সুবিধাভোগী এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল।

জীবিত-মৃত একই পরিবারের তিনজনের নাম হতদরিদ্রের তালিকায় স্থান পেলেও এই ওয়ার্ডের অনেক প্রকৃত হতদরিদ্রদের কারোরই নাম আসেনি তালিকায়। তালিকায় একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নামও দেখা গেছে। শুধু ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডেই নয়, সুরমা ইউনিয়নের অন্যান্য ওয়ার্ড সহ উপজেলার সব প্রায় সবকটি ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের নামের তালিকায় দায়সারা গোঁজামিল থাকার অভিযোগ রয়েছে।

৯ নং ওয়ার্ডের বরকত নগরের বাসিন্দা দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রবাসী সমাজ কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা মোঃ গোলাম রহমান গোলাপ সুনামগঞ্জ২৪.কম কে বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের হতদরিদ্রদের নামের তালিকায় মৃত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিসহ একজন ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের তিনজন কিভাবে স্থান পায়? এটা একটা দায়সারা তালিকা, এখানে হতদরিদ্রদের বদলে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরাই বেশি স্থান পেয়েছে। আমি প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সদুত্তর পাইনি।’

এই তালিকা প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মাহমুদুর রহমান নামে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘যে সকল হারামখোর সচ্ছল পরিবার হতদরিদ্রের মাল খাচ্ছে তাদের বাড়িতে “হতদরিদ্রের বাড়ি” লিখে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া উচিৎ।’

জামাল উদ্দিন নামে একজন মন্তব্য করেছেন ‘এটা দেখে মনে হচ্ছে ভোটার তালিকা। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় ভোটার তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে।’ একই মন্তব্য করেছেন নজরুল ইসলাম ও এম কে মামুন নামে দুজন ফেসবুক ব্যবহারকারী।

এব্যাপারে সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মামুনূর রশীদ সুনামগঞ্জ২৪.কম কে বলেন, ‘পরিষদের প্রত্যেক মেম্বারদেরকে বলা হয়েছে স্থানীয়দের সাথে সমন্বয় করে প্রকৃত হতদরিদ্রদের তালিকা দেওয়ার জন্য। আমার ইউনিয়নের কেউ বাদ পরলে কিংবা স্বচ্ছলদের নাম তালিকায় আসলে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব। তবে উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে সম্প্রতি ২০২০ সালের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে এটি আগের তালিকা। নতুন তালিকা হয়তো আপডেট দেওয়া হয়নি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা সুনামগঞ্জ২৪.কম কে বলেন, ‘ উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের হতদরিদ্রদের তালিকায় সমস্যা নেই, শুধুমাত্র সুরমা ইউনিয়নের তালিকায় একটু সমস্যা আছে। গতকালকে সুরমা ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে মোবাইলে আলাপ হয়েছে। তালিকাটা সংশোধন করে দু একদিনের মধ্যেই ওয়েবসাইটে আপডেট দেওয়া হবে।’

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ আব্দুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবেদককে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলে এখন সব আমলাতান্ত্রিক। অন্যান্য উপজেলার বিষয়ে জানিনা তবে আমার দোয়ারাবাজার উপজেলার কোনো বিষয়ে ইউএনও কোনো কিছুই আমাকে জানান না। এ নিয়ে এমপি মহোদয়ের সাথেও আলাপ করেছি। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হতদরিদ্রদের এই তালিকার বিষয়েও আমি কিছুই জানিনা।’

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ এআর/ এমএআই

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন