বৃহস্পতিবার, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জুন, ২০২০ ইং

রাষ্ট্র কানাডার মতো চাই: আচরনে থাকতে চাই বাংলাদেশের নাগরিকের মতো- সারোয়ার লিটন

খবরটি শেয়ার করুন:

গতকাল রাতে আমার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর ফোন পাই। ফোন গ্রহণ করতেই বলল ‘বন্ধু তুমি আমাকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে সে আশা করিনি। কিন্তু একবার এসে দেখে যেতে পারতে।’ সে আরো বলল ‘বুঝেছি মরলেও তুমি দেখতে আসবে কিনা সন্দেহ আছে আমার ।’ গত ছয়মাস ধরে আমার ঘনিষ্টবন্ধু, বিপদে আপদে যে আমার পাশে দাঁড়ায় তার কোন খোঁজ নিতে পারিনি। আমি জানতাম বন্ধুটি ওই ছয়মাস পারিবারিক নানামুখী সমস্যায় ছিল। আসলে ওই ছয়মাস আমি নানা কারণে খুব ব্যস্ত ছিলাম। ভাবছিলাম দেখা করেই তার সুখ দুঃখের খবর নেব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। চলে আসে করোনা দুর্যোগ। তবে এই দুর্যোগে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে ঝুঁকি নিয়ে গেলাম খালার বাসায়। খালা দেখলো তার জন্য কোন সহায়তাই নেইনি। উল্টো মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা। ঘরে ঢুকলেও নিরাপদ দুরত্বে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। এক সময় তিনি বলেই ফেললেন ‘খালি হাতে গরীবরে দেখতে আইলে আমরার কিতা লাভ?। আইজ্জা মনে অইতাছে বদলা গেছগা”।

আমার বাপ দাদা কৃষক। কৃষকের সন্তান হিসাবে আমি গর্বিত । ২০০৩ সালে হঠাৎ করে জেলার অন্যতম বৃহৎ হাওর তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরের ইকরামপুর বাঁধটি ভেঙে যায়। সম্পূর্ণভাবে ধানের উপর নির্ভরশীল আমাদের পরিবারে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। পরিবারের তেমন কেউই ছিলনা হাওরে যেয়ে জমির ধান কাটার ব্যবস্থা করার মতো। আমরা ছিলাম সম্পূর্ণভাবে কৃষি শ্রমিক নির্ভর। বাড়িতে ছয় মাসের জন্য কৃষি শ্রমিক থাকতো। তাই আমি খুব চিন্তিত মনে সব আশা ছেড়ের প্যান্ট শার্ট আর পায়ে সু জুতো লাগিয়ে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় আড্ডায় চলে গেলাম। কিন্তু মাথায় ছিল ওই ধান ডুবার ভাবনা। আমাদের উপজেলা পরিষদটিও শনির হাওরের পাড়ে। কমবেশি সবারই জমি আছে। তাই আলোচনার প্রধান ছিল হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার কথা। আমার নিরুপায় অবস্থা আর হতাশার কথা বন্ধুরা মনোযোগ দিয়ে শুনে। ওই দিন বিকালে জমিতে ধান কাটতে গেলাম বর্তমানে শিক্ষক তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক কাঞ্চুদা, উপজেলা ছাত্র লীগের তৎকালীন সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক ভাই, উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক বন্ধু তারা মিয়া, উপজেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক বন্ধু আলম জিলানী সোহেলসহ একদল ছাত্র লীগ কর্মী ।

হাওরেরর বোরো ধান কাটা অনেক কঠিন কাজ। কারণ ওই সময় বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার কারণে জমিতে পানি থাকে। তাছাড়া ধানের পাতাও অনেক ধারালো। হাওরে গেলাম কিন্তু আমি আমাদের জমি চিনিনা। তাই কাঞ্চুদা আমাদের মাড়াই খলা থেকে একজন কৃষি শ্রমিক নিয়ে আসে। সে জমি দেখিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা কেউই জমির ধান কাটতে পারছিনা। হাওরের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে পানি ঢুকায় জমিতে পানি বাড়ছে । কাঞ্চুদা আর তারা মিয়া টাকা দিয়ে লোকজন ধান কাটতে লাগিয়েছে। ২৪ কিয়ার জমিতে ভাল ফলন হয়েছে। বিআর-২৯ জাতের ধান। তাই রাতের বেলা একাধিক পাম লাইট (হ্যাজাক বাতি) নিয়ে আসে জিলানী সোহেল।

রাত ৯টা লোকজন ধান কাটছে। পায়ের গোড়ালি সমান পানি এখন উরু সমান উচ্চতা হয়েছে। আমাদের সাথে আরেকজন বিশ্বস্থসঙ্গী হিসাবে ছিলেন মরহুম আব্দুল্লাহ খাঁ আমাদের প্রিয় আর ভালবাসার আব্দুল ভাই। আব্দু্ল ভাই হাতে তুড়ি(টেটা) নিয়ে পানিতে ভেসে থাকা আঁটি বাঁধা ধানের মুঠি জমি থেকে নৌকায় তুলছেন। যাইহোক রাত যখন ৪টা আমি আর কাঞ্চুদা জমি থেকে বাড়ি ফিরে আসি। আর এতে করেই আমাদের পরিবারে যোগ হয় আরো তিনশত মন ধান। হাওরে পানি ডুবলে কৃষকের অমানুষিক পরিশ্রম হয়। আর ধানের পরিমাণ চেয়ে টাকার পরিমাণ বেশি খরচ হয়। তাই কৃষকরা প্রচন্ড মনো কষ্টে থাকেন। ভালবাসার ধান কে ওরসজাত সন্তানের মতোই ভালবাসেন কৃষকগণ। তাই চোখের সামনে পানিতে ধান ডুবার দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না। আবার হাওরে পানি ঢুকলে শ্রমিকের মুল্য বেড়ে যায় তাই ধান কর্তনে ধানের মুল্যের চেয়ে টাকা খরচের পরিমাণ অনেক সময় বেশি হয়ে যায়। আর এজন্যই আমার আব্বা ওই সময় জমি দেখতেও যান না।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

আমার বন্ধুরা ধান না কাটলেও তাদের সহযোগীতায় ধান কাটতে পেরেছিলাম। তখন হাওরের বাঁধ নিয়ে তৎপরতা থাকলেও ধান কাটা নিয়ে কোন তৎপরতা ছিলনা। আজকেও প্রশাসনিক যে তৎপরতা চলছে ধানকাটা নিয়ে তাতে হয়তো কৃষকের নতুন করে ধানের প্রতি ভালবাসা বাড়ার দরকার হবেনা। তবে কৃষকের মনোবল বাড়ে। জীবন থাকতে কৃষকরা ধান ডুবতে দিতে চাননা। কৃষকরা প্রতিদিন তার জমি দেখতে হাওরে যান। একটি করে ধান টিপে টিপে দেখেন কখন কাটবেন। কারণ হাওরে উৎপাদিত বছরের একমাত্র ফসল ধান থেকে্ই আসবে পরিবারের পুরো বছরের খাওয়া আর সকল খরচের যেুাগান । তাই অনেক সময় শীষ ধানে ভরে ওঠলেই কৃষকরা কেটে ফেলেন। এই বিষয়টি বর্তমান প্রশাসন যদি বুঝেন বা জানেন তবে স্বস্তি পাবেন।

এ বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা হাওরে ধান কাটছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাগণও উৎসাহ দিতে ধান কাটতে যান। অধিকাংশ মানুষই কাজটিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আবার অনেকেই এটিকে শুধুই লোক দেখানো বলে উপহাস হিসাবেও চিহিৃত করছেন। আমাদের নিশ্চয় মনে আছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি খালকাটা কর্মসুচী দিয়েছিলেন। তার কোদাল নিয়ে তোলা ছবি তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। একই ভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ বুক সমান পানিতে নেমে ১৯৮৮ সালে ত্রাণ বিতরণ করেছিলেন। যা গ্রাম বাংলার অনেক মানুষের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। আমাদের হাওরপাড়ে বৈশাখ মাসে পাহাড়ী ঢল থেকে ফসল রক্ষায় যখন আমরা স্বেচ্ছাশ্রমে মাটির কাজ করি তখন আমরা নানা রকম কাজ করি। হাওরে কৃষক শ্রমিকের সাথে ভাত খেতে বসে অনেকেই বাহবা পাই। তবে আজকে কেন হাওরে স্বেচ্ছাশ্রমে ধানকাটা কে আমরা কৃষকের সাথে উপহাস হিসাবে চিহিৃত করব?

প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক মানুষের কাজ কে সম্মান দেওয়া উচিত। কারণ সবার চিন্তাই আলাদা। তাই নিজের কথা ও কাজের সম্মান পেতে হলে অন্যর বেলায় এই সম্মানটুকু দিতে হবে। সমালোচনা হতে হবে মার্জিত ভাষায়। কোন এমপি এলাকায় না আসলে সমালোচনা করছি উনি জনতার পাশে নেই। আবার যদি হাওরে কোন এমপি বা নেতা এসে আমাদের সাথে কাজ করেন তবুও সমালোচনা করি। বলি এই আসা লোক দেখানো । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের নেতাদের সমালোচনা করছেন। আসলে এসব আত্মঘাতী। তবে প্রতিপক্ষের বেলায় তাদের অনেকের মুখেই কোন কথা আসেনা বলে জেনেছি।

ধান কাটতে যারা এখন কৃষকের পাশে যাচ্ছেন তারা এক মুঠো হলেও ধান কাটছেন। সামান্য খাদ্য সহায়তা হলেও দিচ্ছেন। পাঁচটি টাকা হলেও দিচ্ছেন। তাদের মন খুশি রাখার জন্য হলেও ভাল ভাল কথা বলছেন। কৃষকরা তাদের এ বিষয়টিকে আনন্দের সাথেই গ্রহণ করছেন। যারা ধান কাটছেন তাদের অনেকেই হাওরপাড়ের ছেলে তাই ধান খুব একটা খারাপও কাটছেন না। রাষ্ট্র টা কানাডার মতো চাই। তবে আমি আচরণে থাকতে চাই বাংলাদেশের নাগরিকের মতো। কথায় কারো কাজ আটকে থাকেনা। তবে মাঝে মাঝে থমকে যায়। তাই আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি এই সময়ে হাওরে নেমে যারা ধান কাটছেন কিংবা যাঁরা কৃষকদের দেখতে হাওরে যাচ্ছেন। আশা করি এভাবেই আমরা আরো মানবিক হবো । এবং প্রকৃত মানবিক রাস্ট্র গঠন করবো। (লেখক- গোলাম সারোয়ার লিটন, শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী)

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ জিএসএল/ আরসি/ এমএআই

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন