বৃহস্পতিবার, ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা জুন, ২০২০ ইং

সাহরি কি তার হুকুম কি তৎসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

খবরটি শেয়ার করুন:

সাইদুজ্জামান আল হায়দার::

সাহরি আরবী শব্দ, যা ‘সাহরুন’ শব্দ থেকে এসেছে।যার অর্থ রাতের শেষাংশ। পরিভাষায় রোজা পালনের জন্য মুমিন বান্দা শেষ রাতে ফজরের পূর্বে যে খাবার গ্রহণ করে থাকেন তাকে সাহরি বলা হয়। রোজা রাখার জন্য এ খাবার গ্রহণ করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ সা.সব সময় রোজার উদ্দেশ্যে সাহরি খেয়েছেন এবং তার প্রিয় উম্মতকে সাহরি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। হাদীস শরীফে আছে, تسحروا فإن في السحور بركة
রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, তোমরা সাহরি খাও। কেননা, সাহরিতে বরকত রয়েছে। (বুখারী: ১৭৮৯)

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

অন্য হাদীসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমাদের ও ইহুদী-নাসারাদের রোজার পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া। (মুসলিম: ২৬০৪)

সাহরির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সা.আরও বলেছেন, এক ঢুক পানি দিয়ে হলেও সাহরি গ্রহণ করো। (ইবনে হিব্বান: ৩৪৭৬)

সাহরি খাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা.আরও বলেন, সাহরি খাওয়া বরকতময় কাজ। এটা ত্যাগ করো না, যদি এক ঢুক পানি দিয়েও হয় তা গ্রহণ করো। নিশ্চয় আল্লাহ এবং তার ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য রহমত বর্ষণ করেন। (মুসনাদে আহমদ: ১১১০১)

সাহরির এ বিধানটি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার প্রতি তার এক বিশেষ নিয়ামত। হাদীস শরীফে আছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নিয়ম ছিলো যদি কোনো মুসলমান এশার পর ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, কিছু খেয়ে বা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই রোজা শুরু হয়ে যেত। শেষ রাতে সজাগ হলেও আর খাওয়া-দাওয়া বা স্ত্রী সহবাসের কোনো সুযোগ ছিল না। উমর রা.একবার এশার পর তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হলেন অন্যদিকে আরেক সাহাবী সিরমা ইবনে কায়েস রা. মাগরীবের পর পর কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, রাসুলুল্লাহ সা.এশার নামাজ আদায় করে নিলেন কিন্তু তিনি জাগ্রত হতে পারলেন না। পরবর্তীতে জেগে খাওয়া-দাওয়া করলেন। ভোরে রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে সমাধান জানতে চাইলে আল্লাহ পাক আয়াত নাযিল করলেন, ‘খাও, পান করো ফজরের কালো রেখা থেকে সাদা রেখা স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা বাকারা: ১৮৭, তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৫১১)
তাই সাহরি খাওয়ার এ সুযোগ আল্লাহর বিরাট নিয়ামত ও অনুগ্রহ। তখন থেকে মুমিন-মুসলমানরা শেষ রাতে জেগে সাহরি খেতেন।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সা.ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে দিনে রোজা রাখার শক্তি অর্জন করো আর দিনে হালকা ঘুমের মাধ্যমে রাত জেগে ইবাদত করার শক্তি অর্জন করো।’ (ইবনে মাজা: ১৬৯৩)
তাইতো রাসুলুল্লাহ স.সাহাবীদেরকে ডেকে বলতেন, ‘তোমরা বরকতময় খাবারের দিকে এগিয়ে আসো।’ (আবূ দাউদ: ২৩৪৬)
সাহরি পেট ভরে খাওয়া জরুরি নয়, বরং যে কোনো খাবার দিয়ে সাহরি গ্রহণ করা যেতে পারে। হাদীস শরীফে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ স.ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিনের জন্য খেজুর কতই না উত্তম সাহরি। (আবূ দাউদ: ২৩৪৭)
অর্থাৎ সাহরি খেতে গিয়ে খুব ভালো মতো না খেলে তা হবে না, এমনটা মনে করা যাবে না। আবার মনে রাখতে হবে এটা সুন্নত। যদি কেউ সময় মতো জাগতে না পারেন এমনকি ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যায়, তাহলে সাহরি গ্রহণ করতে না পারার অজুহাতে রোজা ছেড়ে দেয়াও যাবে না। ঘুম থেকে জেগে সাহরির সময় শেষ হওয়ার পূর্বে যদি একটু পানিও পান করা যায়, তবে তাই করতে হবে এবং তাতে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।
নির্দিষ্ট সময়ে সাহরি খাওয়া সুন্নত।সময়ের পূর্বে সাহরি খাওয়া জায়েজ আছে। রাসুলুল্লাহ স.নিজে দেরি করে সাহরি গ্রহণ করতেন।
আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে বরকতময় সাহরি গ্রহণ করে তাঁর মহান হুকুম রমজানের রোজ রাখার তাওফিক দান করুন।আমীন।

মাসআলা:
১.কোনো কারণে সাহরি খাওয়া সম্ভব না হলেও রোজা রাখতে হবে, কোনো প্রকার বাহানা বা ওজর রোজা ছাড়ার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। ইচ্ছাকৃতভাবে সাহরি বর্জন করা সুন্নতের পরিপন্থী। কারণ, সাহরি খাওয়া সুন্নত। তা ছাড়া নবীজি সা. বলেছেন, সাহরি ছাড়া রোজা রাখা ইহুদি-নাসারাদের ধর্ম। তাই সাহরি গ্রহণ করে ইসলামি রোজার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করা ঈমানদারদের কর্তব্য।

মাসআলা:
২.ফরজ গোসল না করে সাহরি খাওয়া যাবে কী এ পরিস্থিতিতে কী করণীয়?
রমজান মাসে রোজা পালনের উদ্দেশ্যে সাহরি খাওয়া সুন্নত। যদি কেউ এমন অবস্থায় পতিত হয় যে ফরজ গোসল করে সাহরি খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় নেই; তখন অজু করে বা হাত-মুখ ধুয়ে আগে সাহরি খেয়ে নেবেন। পরে গোসল করে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। কারণ, সাহরি খাওয়ার জন্য পবিত্রতা ফরজ নয়, বরং সুন্নত; আর নামাজ আদায় করার জন্য পবিত্রতা ফরজ। গোসল ফরজ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা করে নিতে হবে, বিনা ওজরে বেশি সময় অপবিত্র অবস্থায় থাকা সমীচীন নয়। এতে রহমতের ফেরেশতাদের কষ্ট হয়; তাই দ্রুত পবিত্রতা অর্জন করা জরুরি। (কুদুরি; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি)।

লেখক- মুহাদ্দিস,রাজনীতিবিদ,সমাজসংস্কারক ও কলামিস্ট।

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন