রবিবার, ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

স্বপ্নকে বড় করতে থাকা একজন সুস্মিতার গল্প

খবরটি শেয়ার করুন:

প্রিয়াঙ্কা কর, প্রতিবেদক(নারীমঞ্চ)::

সুস্মিতা দে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনিসহ ৫জন। মা-বাবা,ছোট ভাই আর একটা ছোট বোনকে নিয়ে দিন কেটে যায়। বাবা একজন দর্জি। আর মা গৃহিনী। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে মানবিক বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত সুস্মিতা। থাকেন সুনামগঞ্জের বাঁধনপাড়া এলাকায়। সুস্মিতা লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজের ব্যাক্তিগত জীবনকে উপভোগ করেন অনন্য এক ভালোলাগার কাজের মধ্য দিয়ে। তিনি এই বয়সে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে কম পরিচিত নন। সুনাম রয়েছে অসাধারণ সুরসঙ্গীতের পারদর্শীতায়। সুস্মিতার বাঁশি বাজানোর প্রতিভা জেলা শহরের তরুণ তরুণীদের কাছে কম আলোচিত ঘটনাও নয়। সুনামগঞ্জ২৪.কম এর নারীমঞ্চ প্রতিবেদকের সঙ্গে আড্ডায় গল্পটা জানতে মানা নেই।

সুস্মিতা জানান, যখন নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত তখন থেকেই শখের বশবর্তী হয়ে নিজে নিজেই ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই ছবিগুলো প্রানবন্ত হয়ে উঠতো। নিজের কাছে খুব একটা অস্বাভাবিক মনে না হলেও পাড়া প্রতিবেশির কাছে সুস্মিতার ছবি আঁকার সুনাম ছিলো। আর এমনি করেই কিছুদিন পর সুস্মিতার এক স্বজনের কাছথেকে অঞ্জন চৌধুরী নামের একজন শিক্ষক জানতে পারেন ছবি আঁকার কথা।

অঞ্জন চৌধুরী আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন সুস্মিতাকে আরও দক্ষ করে তোলতে শ্রম দেবেন। তাই ছবি আঁকায় অনেক সহযোগিতা করেন সে সময়। তারপর চারু শিক্ষক স্বপন কুমার সুস্মিতাকে এই কাজে আরও যত্নশীল হতে অনুপ্রাণিত করেন। সুস্মিতা বলেন ‘একটা ছবি আঁকতে(portrait) শুরুতে আমার ৬থেকে ৭ ঘন্টার মতো লাগতো। এখন ৩থেকে ৪ ঘন্টা লাগে। ছবি আঁকতে আপাততো নরমাল পেন্সিলগুলো ব্যবহার করি, আর অয়েল পেস্টেল, পেন্সিল কালার, পোস্টার কালার। আমার অবসর সময় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে কথোপকথন করে, বাঁশি বাজিয়ে, ছবি এঁকেই কেটে যায়’।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

আর ১০টা সাধারণ মেয়ের মতোই সুস্মিতা বেড়ে উঠেছেন নিজের এলাকায়। স্কুল জীবনের ১ম দিনটা হয়তো মনে নেই। আবার স্কুলের অনেক বন্ধুর ভিড়ে একজন সুস্মিতাই হয়তো এই সময়ে অন্য রকমভাবে পরিচিত। একটু ব্যাতিক্রম চিন্তা চেতনা সুস্মিতাকে শিক্ষা জীবনেই করেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সুস্মিতার অসাধারণ সব আঁকা পোর্টেট আর নানা ছন্দের তালে বাঁশির সুর অনন্য প্রতিভার জানান দেয়। যদিও অনেকটাই সাধারণ জীবন যাপনে আর নিজেকে আড়ালেই রাখতে চেষ্টা সুস্মিতার। তবু বন্ধুদের আবদারে লেখাপড়ার সঙ্গে আঁকা আকি আর বাশিতে সময় দেন সুস্মিতা। এগুলো আবার মাঝেমধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতায় সুস্মিতাকে করেছে আত্মপ্রত্যয়ি।

সুনামগঞ্জ২৪.কম এর নারীমঞ্চ বিভাগকে তিনি বলেন ‘আমি হয়তোবা লেখাপড়ায় তেমন ভালো না। তবুও আমার স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগে পড়াশুনা করার। জানি না সেটা পূরণ করতে পারবো কি না। তবুও চেষ্টা করে যাবো।’

সুস্মিতার স্বপ্ন ছোট নয়। শুরুটা হয়তো ছোট স্বপ্ন দিয়ে। কিন্তু দিনে দিনে এই স্বপ্নের পরিধি বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বপ্নকে আরও সুন্দর ও স্বপ্নের পরিধি বড় করেছে সুস্মিতা। সে স্বপ্নই তাকে এগিয়ে রাখে অন্য আর ১০টা মেয়ে থেকে আলাদাভাবে তাকে পরিচিত করে।

আঁকা আকি আর সুর সঙ্গীতের রেওয়াজের বাইরে সুস্মিতা আরও কিছু কাজে সমানভাবে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি বলেন ‘ আমি আমার অবসর সময়ে ড্রেসে, ব্লাউজে ফেব্রিক্স দিয়ে কাজ করি। এইগুলো প্রথমে আমার শখ ছিলো। পরে দেখা গেলো ভালো সারা পেলাম। তারপর ছোটখাটো ব্যাবসায় রুপ নিলো আমার এই কাজ। শুরুটা ভালোই করলাম।’

বাঁশিতে দারুণ পারদর্শীতা নিয়ে সুস্মিতার গল্প জানতে চেয়েছে নারীমঞ্চ। তাই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথোপকথনে এই গল্পও আড়াল রাখেননি। তিনি বলেন ‘আমি যখন সরকারি এস.সি.বালিকা(সতিশ চন্দ্র বালিকা) উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেনীতে অধ্যয়নরত ছিলাম তখন টেস্ট পরীক্ষার আগে বাঁশি হাতে নেই। আমি ইউটিউবে দেখলাম ভারতের এক মেয়ে বাঁশি বাজায়। আমি ভাবলাম আমিও চেষ্টা করি। আমার একটা অভ্যাস হচ্ছে যা দেখি তা-ই নিজে একবার করতে ইচ্ছে করে। মনের মধ্যে একটা কথাই আসে যে হ্যাঁ আমি এটা পারবো,ওটা পারবো।
তো এভাবেই আমি বাঁশি হাতে নেই। নিজে নিজেই ফু দিতে দিতে একসময় আমার বাঁশিতে সুর উঠে যায়। পরে আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জায়েদ মাহমুদ ভাইয়ের কাছে বাঁশি শিখতে যাই। জায়েদ ভাইয়ের অবর্তমানে উনার বাবা শ্রদ্ধেয় কুতুব উদ্দিন স্যারের কাছে শিখি। ’

আর্থিক সমস্যার কারণে সুস্মিতার সামনে অনেক বাঁধাে এসেছে, ভেঙ্গেছে কিছু স্বপ্ন। তবু চেষ্টার কোন কমতি ছিলোনা। বাঁধার প্রাচীর টপকে যেতে শিখেছেন একজন সুস্মিতা। আর স্বপ্ন পূরণের পথে পেয়েছেন পরিবার,বন্ধু-বান্ধবদের অকুন্ঠ সমর্থন। যা দিয়েছে নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস। সুস্মিতা সুনামগঞ্জ২৪.কম কে বলেন ‘সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাই আমার জেঠতু ভাই শোভন দেব (বড়দা) উনার কাছ থেকে। উনি আমায় যেভাবে সমর্থন করেন, আসলে উনার মতো ভাই পাওয়া অনেক ভাগ্যের ব্যাপার’।

তিনি বলেন ‘অনেকেই বলে ছবি এঁকে দিতে। আমি এঁকে দেই। ওরা কিনে নেয়। আর ফেব্রিক্সের আঁকা ওয়ান পিস গুলো আঁকার ওপর নির্ভর করে ৫০০ থেকে ৬০০ এরকমই নেই প্রতিটাতে। লেখাপড়ার পাশাপাশি একজন নারী হয়েও কিছু করতে চেয়েছি। শখ থেকে করা এই কাজগুলো আমাকে সময়ে সময়ে অর্থনৈতিকভাবে ভালোই সহযোগিতা করছে’।

সুস্মিতা নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন ‘প্রত্যেকেরই নিজের passion আছে। এই passion অনুযায়ী পরিশ্রম করে যেতে হবে। তাহলে ভালো কিছু হবে। সবকিছুতেই বাঁধা থাকে। তাকে উপেক্ষা করে যেতে হবে। নারীদের সবকিছু করারই যোগ্যতা আছে, যদি পরিশ্রমী হয়ে সেদিকে এগিয়ে যেতে পারেন। তবেই আসবে সাফল্য।’
সুনামগঞ্জ২৪.কম এই আত্মপ্রত্যায়ী নারীর অনাগত সুন্দর দিনগুলোর সফলতা প্রত্যাশা করে। সকল নারীর জীবন হোক সমৃদ্ধ।

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ নারীমঞ্চ/ পিকেপি/ এমএআই

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন