রবিবার, ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

হিয়ার গল্প -মাহদিয়া আঞ্জুম মাহি

খবরটি শেয়ার করুন:

বৃষ্টি ভেজা সকাল। সারারাত এত বেশি বৃষ্টি হয়েছে যে মনে হচ্ছে এই বুঝি বন্যার পূর্বাভাস। যদিও নিম্ন গ্রাম অঞ্চলে বন্যা হতে আয়োজন করে বৃষ্টির কোনো প্রয়োজন হয় না। তবুও এই বৃষ্টি যে তারই সংকেত। আজ সারারাত অঝর ধারায় বৃষ্টি হয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে কার না ভালো লাগে। এই বৃষ্টির ফোঁটা যে হৃদয়কে স্পর্শ করে ছুঁয়ে যায় জন্ম জন্মান্তে। কারো কারো ক্ষেত্রে এই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ অসহ্য বিরক্তিকর। আবার কারো ক্ষেত্রে এটি অতি আবেগময় অতি প্রেমময়। বৃষ্টির একেকটা ফোঁটা যেন প্রিয়জনের সাথে কাটানো একেকটা মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। এজন্য হয়তো প্রেমপ্রিয় মানুষগুলোর কাছে বৃষ্টি এতটা রোমাঞ্চকর। ভালো লাগার জিনিসগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে টিভির সামনে বসে আছে হিয়া নামের মেয়েটি। খুব মনোযোগ সহকারে বাংলা চ্যানেলের একটি সংবাদ দেখছে সে। হঠাৎ করে তার চোখটা টিভির পর্দার মধ্যে কোন এক স্থির জায়গায় এসে আটকে গেল। বাবা-মা হারানো রিফাত ১০/১২ বছর বয়সী ঢাকা শহরের এক বস্তিতে মানুষের অবহেলা আর অবজ্ঞার স্বীকার হয়ে বেঁচে আছে। গতকাল রাত থেকে সে নিখোঁজ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আজ সকালে ফুটপাত থেকে তার মৃত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাতের ভারী বর্ষণ তার জীবনের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। এই বৃষ্টি কারো জীবনে আনন্দ বয়ে আনে আবার কারো জীবনে বয়ে আনে কালো অন্ধকার। কাউকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখায় আবার কারো জীবনের প্রদীপ নিভাতে সাহায্য করে। এই বৃষ্টির কারণে আজ রিফাতের মৃত্যু হয়েছে। মাথার উপর ছাঁদ না থাকার কারণে সারারাত তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। আবার দেখা যায় প্রেম প্রিয়সী মানুষেরা মাথার উপর ছাঁদকে উপেক্ষা করে খোলা মাঠে আকাশের নিচে এসে বৃষ্টিতে ভিজতে। বৃষ্টিকে তারা প্রাণভরে উপভোগ করে। তাদের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ রিফাতের মতো হাজারো রিফাত বৃষ্টির ছোঁয়াকে অগ্রাহ্যও করতে পারে না, আবার সহ্যও করতে না পেরে শহরের আনাচে কানাচে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। একই বৃন্তে দুটো ফুল কিন্তু দুটোই আলাদা জগতে অবস্থান করে। দৃশ্যটা দেখে হিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল, বিষন্নতায় ডুবে গেল।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

বরাবরের মতো বই খাতা গুছিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্য রওয়ানা দিল হিয়া। কিন্তু সকালের সংবাদটা এখন ও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিষ্ঠুর এই জগৎ নিষ্ঠুর এই জগতের মানুষ কিন্তু প্রকৃতিও তার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর হওয়ার ক্ষমতা রাখে। আজকের রিফাত তার প্রমাণ। রাতের বৃষ্টির পর সকালের প্রকৃতি যেন নতুন করে সৌন্দর্য ফিরে পেল। সৌন্দর্যের ডানা মেলে সে বসে আছে। হাতছনি দিয়ে ডাকছে প্রকৃতি প্রেমিকদের । প্রকৃতি প্রেমিকরা এই ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতেই পারবে না। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটছে আর ভাবছে হিয়া। কি যেন প্রকৃতির এক অদৃশ্য মায়ায় পড়ে গেছে মেয়েটি। ভাবতে ভাবতে গুটি গুটি পায়ে সে স্কুলের কাছাকাছি চলে এসেছে। হঠাৎ তার মনে পড়লো আজকে বাসা থেকে কলম আনতে সে ভুলে গেছে। এখন কি করবে? হাতেও সময় কম। কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে বাসায় গিয়ে কলম নিয়ে আসা সম্ভব নাহ্। আর কলম ছাড়া স্কুলে যাওয়া আর না যাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। হঠাৎ করে আবার তার মনে পড়লো সকালে তার মা চকলেট খাওয়ার জন্য পাঁচ টাকার একটি চকচকে নোট তাকে দিয়েছিলেন। এখন এই টাকা দিয়ে চকলেটের বদলে কলম ক্রয় করা যেতে পারে সামনের টঙ্গের দোকান থেকে। যাইহোক মনে কিছু স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে এখন। মনে মনে তার মাকে ধন্যবাদ দিতে লাগলো। সকালে যদি মা টাকা টা না দিতেন তাহলে কত সমস্যার মধ্যেই না পড়তে হতো তাকে।

মজনু চাচা, আমাকে একটা কলম দিন তো। সুন্দর দেখে দিবেন কিন্তু। মজনু স্থানীয় দোকানদার। দোকানি হিয়ার কথা শুনে মুচকি হাসি দিয়ে বেশ কয়েকটি কলম হিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, দেখ কোনটা তোমার পছন্দ হয়। তোমার পছন্দ মতো একটা বেছে নাও। হিয়া এক এক করে বেছে বেছে কালো রঙের কলমটাই পছন্দ করলো। পৃথিবীতে এতো বর্নহীন রঙ থাকতে তার পছন্দ যে কেনো ‘কালো’ রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ সেটা সে নিজেই জানে না। পাঁচ টাকার চকচকে নোট দোকানিকে দিয়ে তার পছন্দের কলমটা নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে স্কুলের দিকে আবার হাঁটা শুরু করলো।

এখন সে প্রায় স্কুলের গেটের সামনে চলে এসেছে। কিন্তু পেছন থেকে আপু আপু ডাক আসতে থাকলো একটি ছোট্ট ছেলের কন্ঠে। কিন্তু এ নামে তাকে কে ডাকবে? তার তো কোনো ছোট ভাই নাই। তবুও বার বার ডাকটা কানে আসছে। এখন সে পিছনে ফিরে তাকালো। সত্যি তো একটা ছেলে ৭/৮ বছর বয়সী সে আমাকে উদ্দেশ্য করে আপু ডাকছে আর আমার দিকে ছুটে আসছে। কিন্তু কেন? আমি কোনো ভুল করি নি তো? এরকম প্রশ্ন জাগলো হিয়ার মনে। সে নিজের জায়গায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এবার ছেলেটা দৌড়ে হিয়ার সামনে আসলো। হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটি বলতে লাগলো “আপু কাল থেকে আমি কিচ্ছু খাইনি পানি ছাড়া” তোমাকে দোকান থেকে বেরুতে দেখে পিছন পিছন ডাকছিলাম। ক্ষুদার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে দোকানির কাছে একটা বিস্কুট চেয়েছিলাম কিন্তু আমার কাছে টাকা না থাকার কারণে দোকানী আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমাকে কিছু খেতে দিবে আপু? এই বলে ছেলেটা কেঁদে ফেললো।

এই ছোট্ট চেহারায় অনেক মায়া জড়িয়ে আছে। এই চেহারা নিয়ে রাজপ্রাসাদে থাকার কথা কিন্তু সে রাস্তায় রাস্তায় খাবারের জন্য ঘুরছে কেন। ওর বাবা মা কোথায়? সন্তানের প্রতি কি তাদের কোনো দায়িত্ব নেই? জন্ম দিয়েই কি তারা বাবা মা সেজে বসে আছে ?
আচ্ছা! তোমার নাম কি ভাই? আর তোমার বাবা মা কোথায়? আপু আমার নাম হাশেম। আমার মা জন্মের সময় মারা গেছেন। তারপর বাবা নতুন বিয়ে করেছেন। ঘরে আমার সৎ মা। সৎ মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি।
ছেলেটার কথা শুনে হিয়ার অনেক মায়া লাগছে। কিন্তু তাকে এই পরিস্থিতিতে কি বলে শান্তনা দিবে আর সাহায্য-ই বা করবে কিভাবে তার কাছে তো কোনো টাকাও নাই। এই জগৎ টা বড়ই অদ্ভুত। একে চেনা বড় দায়।

কি ভেবে যেন হিয়ার মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। সে বললো, ঠিক আছে হাশেম তুমি আমার সঙ্গে এসো। হিয়া হাশেমকে নিয়ে আবার মজনু চাচার দোকানে গেল। এখানে এসে তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হলো। এছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
মজনু চাচা, আগে যে আপনার কাছ থেকে আমি একটি কলম নিয়েছিলাম এখন সেটি ফেরত দিতে এসেছি। আসলে আমার ব্যাগের মধ্যে আমি আমার হারিয়ে যাওয়া কলমটা খুঁজে পেয়েগেছি। তাই এই কলমের আর দরকার নাই। আপনি আপনার কলম টা ফেরত রেখে দিন। দোকানি এখন হিয়ার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। আরে বলে কি মেয়েটা, বিক্রিত জিনিস আমরা ফেরত নেই না। আর আমিও নিতে পারবো না। তাছাড়া কলম রেখে আমি তোমাকে টাকা ফেরত দিতে পারবো না। আর তোমার সাথে এই ছেলেটি কেন? ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে মজনু চাচা বললেন- একবার তাড়িয়ে দিয়েছি তুই আবার এখানে কি করিস? দোকানির কথা শুনে হাশেম হিয়ার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে রইল। তখন হিয়া রেগে গিয়ে বললো! চাচা হাশেম আমার সাথে এসেছে। আর আপনাকে টাকা ফেরত দিতে হবেনা আর আমিতো টাকা ফেরত চাইনি। আপনি বরং কলমটা রেখে আমাকে একটা বিস্কুট দিয়ে দিন তাহলেই হবে। দোকানি এবার আসল ঘটনা বুঝতে পারলো। তাই আর কথা না বাড়িয়ে কলম রেখে একটা বিস্কুট দিয়ে দিল।

এবার হাশেমকে হিয়া বললো- এই নাও ভাই বিস্কুট টা খেয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিও। আসলে আমার কাছে কোনো টাকা নাই তাই একটা বিস্কুট ছাড়া আর তোমাকে কিছু দিতে পারলাম না। তারপর সে গলা থেকে তার ‘রুপার’ চেইনটা খুলে হাশেমের হাতে দিয়ে বললো নাও এটা বিক্রি করে তুমি পেট ভরে খেয়ে নিও। এখন হাশেমের চোখে কৃতজ্ঞতার পানি ছলছল করছে। ঠোঁট কাপছে কি যেন বলতে চায় কিন্তু এই মুহূর্তে কি বলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে হয়তো সে তার ভাষা হারিয়ে ফেলছে। কান্না বুকের মাঝে চেপে সে ছোট্ট করে একটা হাসি দিল। চোখে আনন্দের অশ্রু। হিয়ার কাছে মনে হচ্ছে তই মুহূর্তে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্য দৃশ্য দেখছে। এই ছোট্ট হাসিই জগতের শ্রেষ্ঠ হাসি। জগৎ বড়ই অদ্ভুত!

মে অ্যাই কামিং স্যার?
নো কামিং।
ক্লাসে এখন বাংলা শিক্ষক এনামুল হক স্যার ক্লাস নিচ্ছেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কড়া শিক্ষকের তালিকা করলে হয়তো উনার নামটি প্রথমেই চলে আসবে। এখন কয়টা বাজে? স্যার ১০ টা ২০ মিনিট। ক্লাস শুরু হয় কয়টায়? স্যার ১০ টার সময়। তাহলে ২০ মিনিট দেরি কেন? এতক্ষণ কোথায় ছিলে স্কুলের নাম করে? তোমার মতো ভালো শিক্ষার্থীরা যদি এভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তাহলে তোমাদের দেখে ক্লাসের বাকি শিক্ষার্থীরা কি শিখবে? দুই দিন পর পরীক্ষা শুরু সেদিকে কি কোনো খেয়াল আছে? স্যার একটার পর একটা কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন হিয়াকে। কিন্তু হিয়া স্যারের কোনো কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো স্যারের কথাগুলো শুনে যাচ্ছে। স্যার এক পর্যায়ে এসে বললেন, আজকে দেরি করে আসাতে তোমাকে পানিশমেন্ট পেতেই হবে। স্যার এবারের মতো ক্ষমা করে দিন আর কখনো আমার দেরি হবে না। স্যার কি ভেবে যেন হিয়াকে ইশারায় ক্লাসে ঢুকতে বললেন। হিয়া মনে মনে ভাবছে সূর্য আজকে সত্যি পূর্ব দিকে উঠেছিল তো? স্যার এত সহজে পানিশমেন্ট বাতিল করে দিলেন। যাইহোক অবশেষে স্যারের কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।

সবাইকে প্রিয় শিক্ষক শিরোনামে রচনা লিখতে দেওয়া হলো। প্রিয় শিক্ষকের জায়গায় অপ্রিয় শিক্ষক হলে হয়তো সবাই এনামুল স্যারকে নিয়েই লিখতো। কিন্তু আপাততো এই সুযোগটা নাই। সবাই যার যার মতো লেখা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু হিয়ার কলম না থাকায় সে চুপচাপ বসে আছে। স্যারের দৃষ্টি এখন হিয়ার দিকে। কারণ জানতে চাইলে হিয়া বলে ভুল করে বাসায় কলম ফেলে এসেছে। স্যার তো এখন রেগেমেগে আগুন। প্রথমত দেরি করে স্কুলে আসলো আর দ্বিতীয়ত কলম ছাড়া। না জানি কপালে কি আছে। স্যার হিয়াকে বললেন, হিয়া তুমি সোজা ক্লাসের বাহিরে চলে যাও। আজকে তোমাকে ক্লাস করতে হবে না। হিয়া কোনো কথা না বলে স্যারের কথায় ক্লাসের বাহিরে চলে গেল। কারণ সে জানে আর কোনো কথা বললেও স্যার শুনবেন না। তারচেয়ে চুপ থাকাই মঙ্গল। অন্ততো স্যারের বক বক শুনতে হবে না। ক্লাসের অর্ধেক সময় তিনি লেকচার দিয়ে পার করিয়ে দেন তাও আবার পড়াশোনার বাহিরে। এই স্যারের আচরণ বিচিত্র রকমের। চেনা বড় মুশকিল। একটু পর আবার হিয়াকে ক্লাসে ডেকে বললেন সুন্দর করে সবাইকে এই রচনাটি লিখে দাও ব্লাকবোর্ডে। মাঝে মাঝে স্যার হিয়াকে দিয়ে পুরো ক্লাস করাতেন। স্যারের প্রিয় ছাত্রী হিয়া। তাই সবসময় যেকোনো জিনিস হিয়ার মাধ্যমেই সবার কাছে দিতেন। হিয়া ব্লাকবোর্ডের মাঝে লিখে দিত আর সেটা সবাই খাতায় তুলে নিত। এভাবেই আজকের ক্লাস সমাপ্ত করে হিয়া বাড়িতে চলে গেল।

চলছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। ইতোমধ্যে ৫টি পরীক্ষা শেষ। এখন শুধু ইসলাম শিক্ষা পরীক্ষা বাকি রয়েছে। কালকে পরীক্ষাটা ভালোমতো দিতে পারলেই শুকরিয়া। কিন্তু হঠাৎ রাতে হিয়ার প্রচন্ড জ্বর হয়। এই জ্বর নিয়ে কাল কিভাবে পরীক্ষা দিবে সেই চিন্তায় মা অস্থির হয়ে আছেন। লক্ষ লক্ষ শিশুর মতো সেদিন সেও পরীক্ষার হলে এসে উপস্থিত হলো। রাতে ঔষধ খাওয়ার পর জ্বরটা কমেছে। মনে হচ্ছে পরীক্ষা দিতে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। সবাই লেখা শুরু করে দিয়েছে। হিয়াও মনোযোগ সহকারে প্রশ্নগুলো উত্তর পেপারে লিখছে। প্রায় ১ঘন্টা হয়ে গেছে। হিয়া ৫০ মার্কস আনসার করছে। হঠাৎ রুমের ভেতরে কিসের একটা আওয়াজ আসলো। মনোযোগ পেপারে ছিল তাই কেউ বেশি খেয়াল করে নি। হঠাৎ ম্যাম চিৎকার দিলে বললেন সর্বনাশ! এখানেতো একজন শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আশ্চর্য! অসুস্থ আমি আর অজ্ঞান হওয়ার কথাও আমার কিন্তু তা না হয়ে আরেকজন অজ্ঞান হলো কিভাবে? ম্যাম মেয়েটির গায়ের ইউনিফর্ম দেখে বুঝতে পারলেন এই শিক্ষার্থী আমাদের স্কুলের। হ্যাঁ, সে আমার সহপাঠী “ইমা”। ইতোমধ্যে স্কুলের অন্য শিক্ষকরাও এসে হাজির হলেন। অতঃপর ইমাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হসপিটালে নেওয়া হলো।

এদিকে বেঞ্চের উপর ইমার পরীক্ষার পেপার পড়ে রইল। ম্যাম লক্ষ্য করলেন ইমা কোনো প্রশ্নের আনসার করতে পারে নি। তার পেপারটা ফাঁকা রয়ে গেছে। আর এটা বোর্ডের পরীক্ষা এখানে কেউ খুঁজে দেখবে না কে কি কারণে পরীক্ষা দেয়নি। এখন মেয়েটার পেপারে কিভাবে পাস মার্কস তুলে দেওয়া যায় সেই চিন্তায় পড়ে গেলেন ম্যাম। একটু পরে ম্যাম আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন ” তোমাদের মধ্যে কেউ একজন মেয়েটাকে একটু সাহায্য করো তার পেপারে পাস মার্কস তুলে দাও যদি তোমাদের কারো লেখা শেষ হয়ে যায়” একটু আগে পরীক্ষা শুরু হয়েছে আর এখন কারো পরীক্ষা শেষ হবার কথাও না৷ তবুও ম্যাম বললেন চাইলে তোমরা কেউ একজন ২/৩ টা প্রশ্নের উত্তর লিখে দাও। ম্যামের কথাগুলো সবাই শুনলেও কেউ পাত্তা দেয়নি। বর্তমান সময়ে নিজের খেয়ে কেউ অন্যের উপকার করতে চায় না স্বার্থ ছাড়া। এই রুমে অনেক মেধাবী স্টুডেন্ট রয়েছে যারা চাইলে এতটুকু সাহায্য করতে পারতো কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসে নি। সবাই নিজেদের লেখা নিয়ে ব্যস্ত। অনেকের ক্ষেত্রে পাস করাই উদ্দেশ্য নয় বরং প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়াটা উদ্দেশ্য। নিজের লেখা বাদ দিয়ে আরেকজনের জন্য রিস্ক নিতে কেউ রাজি নয়।

এদিকে ম্যামের কথা শুনে হিয়ার মনটা ছটফট করছে। সে জানে, সে যতটুকু লিখেছে তাতে সে পাস করবে। হয়তো গোল্ডেন পাবে না৷ কিন্তু এই মুহূর্তে গোল্ডেন পাওয়ার চেয়ে ঐ মেয়েটার পাস মার্কস পাওয়াটা জরুরি। ইমাকে সাহায্য না করা পর্যন্ত হিয়ার মনে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। নিজের পেপারে কলম যেন হাঁটতেই চাইছে না যদিও সব প্রশ্নের উত্তর তার জানা। হিয়ার সাথে অনেকেই গোল্ডেন পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করে আছে তাদের অনেকেই এই কক্ষে উপস্থিত আছে। কিন্তু এখন সে প্রতিযোগিতার কথা ভুলে গেছে। নিজের পেপার আর কলম গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ম্যাম, আপনি অনুমতি দিলে আমি ইমার পেপারে উত্তর লিখে পাস মার্কস তুলে দিতে পারবো। ম্যাম জিগ্যেস করলেন, তোমার লেখা শেষ হয়ে গেছে? না ম্যাম আমার অনেক লেখা বাকি আছে। কিন্তু আমার নিজের লেখা কমপ্লিট করতে চাইলে ইমার পেপারে লিখার সময় পাবো না। তাই ওর পাস মার্কস তুলে দিয়ে আমি আমার লেখা শুরু করবো। ম্যাম আপত্তি করলেন। এতে যদি তোমার ক্ষতি হয়? তুমি বরং তোমার লেখাটা আগে শেষ করো, তারপর ওর পেপারে লিখবে। না ম্যাম কোনো সমস্যা নাই। আমি যতটুকু লিখেছি আশা করি পাস মার্কস উঠে যাবে। এখন শুধু ভালো মার্কস পাবার লেখা বাকি আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না আমার কোনো অসুবিধা হবে না আপনি ইমার পেপার দিন আমি দ্রুত লিখে দিচ্ছি। হিয়ার অসুস্থতার কথা ভুলে গেল। হাতের স্পিড বাড়ালো। হাতের রগ গুলো ফুলে গেছে। তবুও সেদিকে লক্ষ্য করছে না ক্রমাগত পেপারে লিখে যাচ্ছে। এভাবে সে একদিনে দুজনের পরীক্ষা দিলো।

বাসায় এসে আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো হিয়া মায়ের সাথে শেয়ার করলো। মা তো রেগেমেগে আগুন হয়ে গেছেন। আর রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ প্রত্যেক মায়ের কাছে আগে তার সন্তান, আর সেই সন্তানের ভালো কিছু আগে তারপর অন্য কিছু। তাছাড়া হিয়ার সাথে অনেকের বিরোধ রয়েছে পড়াশোনা নিয়ে। সামান্যর জন্য পিছিয়ে গেলে সেটা মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। যাইহোক, মা বললেন- তা আপনি সমাজ সেবা কবে থেকে শুরু করেছেন? আর নিজের সেবাটা ঠিকমতো করে এসেছেন তো? হিয়া বললো -মা তুমি যে কি বলো না। আমার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আর ইনশাআল্লাহ ইমা ও পাস করবে। হিয়ার মা বাহিরে থেকে রাগী ভাবটা দেখালেও ভেতরে ভেতরে মেয়েকে নিয়ে গর্ববোধ করছেন। কারণ এই বয়সে এরকম মন মানসিকতা সবার হয় না, আর এই পরিস্থিতিতে বড়রাও এরকম ঝুঁকি নেয় না অথচ উনার ছোট্ট হিয়া সেই ঝুঁকি নিয়ে আরেকজনের উপকার করেছে যা ঐ মেয়েটি জীবনেও ভুলতে পারবে না। সত্যি এটা প্রশংসনীয়। এরপর মা মেয়ে মিলে প্ল্যান শুরু করলেন কিভাবে অবসর সময়গুলো কাটাবেন তারা…!!

[লেখক: মাহদিয়া আঞ্জুম মাহি, ছাত্রী- সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ]

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন