রবিবার, ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নিয়তি – মাহদিয়া আঞ্জুম মাহি

খবরটি শেয়ার করুন:

গতকাল থেকে অঝর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তবে আজ একটু বেশি। শেষ কবে নীলার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেটা হয়তো ইমন ভুলেই গেছে। বৃষ্টির স্নানে কবে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে সেটাই এখন সে খুঁজার চেষ্টা করছে। বৃষ্টির দিনে কদম ফুলের কি এক অপরুপ বাহার ৷ সৌন্দর্যের পাখা মেলে সে প্রকৃতির সাথে মিশে যায়। তাইতো বর্ষাকালে ফুলের রাজা হিসেবে কদমকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই কদমফুল হাতে রাস্তার মোড়ে প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করার মজাই আলাদা। মনে পড়ে সেই অতীতের সোনালী দিনগুলোর কথা৷ নীলার সবচেয়ে প্রিয় ফুল ছিল কদম। নীলার খোপাতে কদমফুল গুজিয়ে দেওয়া একমাত্র মানুষটাই ইমন। প্রতিদিন দেখা করার সময় একগাদা কদমফুল মেয়েটার লাগবেই। নীলার কথা মনে পড়তেই ইমনের মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। এই বিষন্ন মন নিয়ে সে হাজির হলো রমনার বটমূলে৷ সেখান থেকে একগাদা কদমফুল হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো ক্যাম্পাসের দিকে।


আজ সকাল ১০ টার দিকে নীলার সাথে তার ক্যাম্পাসে দেখা করার কথা। হঠাৎ করেই মেয়েটা আজ তাকে দেখা করতে বললো। যদিও বিগত কয়েকদিন ধরে নীলার মধ্যে বেশ কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবুও ইমন এ বিষয়ে তেমন বিভ্রান্ত হচ্ছেনা ৷ কারণ নীলাকে সে ভালো করে জানে এবং বুঝে। নীলা হচ্ছে সেই মেয়ে, যাকে ইমন অন্ধের মতো বিশ্বাস করে, নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। যার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অবহেলা ইমনের বুকে সমুদ্রের ঢেউ তৈরি করে। নীলা ভীষণ রাগী আর জেদি টাইপের মেয়ে কিন্তু ইমনের জন্য তার বুকে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। ইমন কিছুদিন ধরে নীলাকে একটি সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছে কিন্তু সময়ের অভাবে আর দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু নীলা যেহেতু আজ নিজে থেকে দেখা করতে চাইছে তাই ইমনকে ঝড় তুফান উপেক্ষা করে হলেও আজ দেখা করতেই হবে। সে জানে আজ যদি দেখা না করে তাহলে নীলা কেয়ামত ঘটিয়ে ছাড়বে। নীলার প্রতি সে অনেক দূর্বল, তাইতো ইমন ভয়ে থাকে প্রতিনিয়ত নীলাকে হারানোর । ইমন মনে মনে ঠিক করলো নীলাকে সে আজকেই সারপ্রাইজটা দিবে। সারপ্রাইজটা শুনে হয়তো নীলা অনেক খুশি হবে। এই মুহূর্তে ওর আনন্দ মাখা মুখটা দেখতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

দূর থেকে দেখা যাচ্ছে নীলা ক্যাম্পাসের দিকে এগিয়ে আসছে। নীল শাড়িতে মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। আজও সে নীল শাড়ি পড়ে এসেছে। কিন্তু ওর সাথে ছেলেটা কে? নীলা কি জানেনা ওর সাথে অন্য কাউকে দেখলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। সে তো জানে তার পাশে কাউকেই আমি সহ্য করতে পারি না৷ তবুও আজ ইচ্ছে করেই আমাকে রাগানোর জন্য হয়তো কোনো ছেলে বন্ধুকে তার সাথে নিয়ে এসেছে। আসুক আজ ওকে ইচ্ছেমতো বকে দিবো। যাতে ভবিষ্যতে এভাবে কাউকে পাশে না রাখে। আমার যে খুব কষ্ট হয় সেটা কি সে বুঝে না।

নীলা এসেই প্রশ্ন শুরু করলো, ইমন কখন আসলে?
আশ্চর্য! এতো দিন পর দেখা হলো নীলার সাথে, কই আমাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরবে তা না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে যেন আমি ওর অপরিচিত কেউ হই। কেমন আছি সেটা জিগ্যেস না করেই বলছে আমি কখন আসলাম। আমি উত্তর দিলাম, কিছুক্ষণ আগে আসলাম। নীলা আমার দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আমার সাথে কথা বলছে। আমার হাতে নীলার সবচেয়ে পছন্দের ফুল কিন্তু সেদিকে মেয়েটার কোনো নজর নেই। অথচ আগে যখন ওর সাথে দেখা হতো আর আমার হাতের কদমফুল পেয়ে সে তখন আমাকেই ভুলে গিয়ে ফুলের দিকে মনোযোগ দিতো যেন এই প্রথম সে কদমফুল দেখতে পেয়েছে৷ কিন্তু আজ নীলাকে এত অচেনা লাগছে কেন?

নীলা বলতে শুরু করলো। ইমন আজ তোমাকে কিছু জরুরি কথা বলবো বলে ডেকেছি। তোমাকে অনেক বার বলেছি আমাদের বিষয় নিয়ে বাবার সাথে কথা বলতে কিন্তু তুমি পারলে না বাবার সামনে দাঁড়াতে, কারণ সেই যোগ্যতা তোমার নাই।
ইমন নীলার কথার মাঝখানে বলে উঠলো, নীলা আজ তোমাকে এমন একটি সারপ্রাইজ দিবো যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। নীলা ইমনকে থামিয়ে সে আবারও বলতে লাগলো, থাক আমার আর কল্পনা করতে হবে না আর তোমার সারপ্রাইজ শোনার কোনো ইচ্ছে আমার নাই। আজ আমি কি বলতে এসেছি সেটাই তুমি ভালো করে শুনে নেও। এই যে আমার সাথে যে ছেলেটিকে দেখছ ওর নাম রেহান। আগামী মাসের ২ তারিখে আমাদের বিয়ে। আর মাত্র ২৫ দিন বাকি আছে। সময়মতো তোমার হাতে বিয়ের কার্ড পাঠিয়ে দিবো আশা করি বিয়েতে আসবে।

আর আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না, এখানেই সবকিছু সমাপ্ত। কারণ আমি বুঝে গেছি আমাকে বিয়ে করার কোনো যোগ্যতা তোমার নাই। আর তোমার মতো ছেলে আমার সাথে যায় না। পারলে নিজের মতো কাউকে খুঁজে বিয়ে করে নিও। তোমার যা অবস্থা কোনো মেয়ে তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে বলে মনে হয় না। ইত্যাদি হাজারো কথার আঘাত করতে শুরু করলো ইমনকে। সে ইমনকে কোনো কথা বলার সুযোগ পর্যন্ত দিলো না। সারপ্রাইজটাও শুনলো না। মানসিকভাবে ইমনকে খুন করে নীলা রেহানের হাত ধরে এখান থেকে চলে গেল। ইমন নীলার চলে যাওয়ার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে ভাবতে লাগলো এটাই কি তার নীলা? নীলার বলে যাওয়া কথাগুলো শুনে ইমন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার মুখে বলার মতো কোনো ভাষা নেই। কি বলবে নিজেও বুঝতে পারছে না।

বাসায় এসে নীলা কান্নার সাগরে ভেসে ওঠেছে। যার সামনে কোনোদিন চোখ তুলে কটু কথা বলেনি আজ সেই মানুষটাকেই কথার আঘাতে রক্তাক্ত করে এসেছে৷ অনেক অপমান করেছে। নিজেকে অপরাধী সাজাতে এরকম মিথ্যা নাটকের আশ্রয় নিতে হয়েছে আজ তাকে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই তার হাতে। ইমনকে সে অনেক ভালোবাসে তাই ভালোবাসার মানুষকে সারাজীবন সুখে রাখার জন্য এরকম মিথ্যা কথা বলা কোনো অন্যায় না। আচ্ছা, ইমন কি বুঝবে না এগুলো যে আমার মনের কথা না। আমি যে তাকে কতটা ভালোবাসি সেটাতো ইমন ভালো করেই জানে। কিন্তু, তবুও আজ সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কারণ আমি চাই ইমন আমাকে ভুল বুঝে আমার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যাক। নতুন কাউকে জীবনে বেছে নিক। আমি জানি আজকে সে আমাকে কি সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইমন হয়তো জানে না আমি বাবার হাতে পায়ে ধরে তার এই সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করেছি। হ্যাঁ, ইমনের একটি চাকরি হয়েছে। এই কথাটা আমাকে সে বার বার বলতে চেয়েছে কিন্তু আমি তাকে সেই সুযোগ দেই নি। আজকের এই সুখবর পাওয়ার জন্য আমি দীর্ঘ দিন ধরে অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু নিয়তির কি খেলা, সেই আনন্দের মুহূর্ত যখন সামনে আসল তখন অন্য আরেকটি দুঃখ এসে আমার সামনে হাজির হলো। যাকে সারাজীবন পাশে পেতে চেয়েছি আজ তাকেই নিজের জীবন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি।

গত কয়েকবছর ধরে আমি মাথা ব্যাথায় ভুগছি। আমার মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হয়৷ এ যেন এক অদৃশ্য ব্যাথা যা প্রাণ নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। বলা নেই, কওয়া নেই যেকোনো সময় ব্যাথাটা আমার মাথায় ভর করে বসে থাকে। তখন আমার খুব কষ্ট হতো। এর জন্য বাবা আমাকে অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন। আমার কি অসুখ হয়েছে বাবাকে জিগ্যেস করলে বাবা বার বার একই উত্তর দেন, এটা নাকি মাইগ্রেনের ব্যাথা । কিন্তু কয়েকদিন আগে আমি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ি। বাবা আমাকে দ্রুত হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দেন৷ চিকিৎসা শেষে আমরা বাড়িতে চলে আসি। সবসময় দেখতাম বাবা আমার কাছ থেকে এই বিষয়ে কি যেন একটা লুকাতে চেষ্টা করতেন, বিশেষ করে ডাক্তারের রিপোর্ট। কিন্তু আমি ততটা গুরুত্ব দিতাম না৷ একদিন ঔষধ খাওয়ার নাম করে অনেক কষ্ট করে ডাক্তারের রিপোর্ট গুলো বাবার রুম থেকে বের করলাম। আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তাই হলো। মাইগ্রেনের ব্যাথা না আসলে আমার ব্রেইন টিউমার হয়েছে। এজন্য বাবা সবসময় আমার কাছ থেকে ডাক্তারের রিপোর্ট লুকিয়ে রাখতেন আর মাইগ্রেনের ব্যাথা বলে আমাকে সান্ত্বনা দিতেন। কিন্তু কেন বাবা আমার কাছ থেকে এত বড় একটি সত্য লুকিয়ে রাখলে? এই সত্যি কথাটা আগে জানলে হয়তো আমার এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে আমি অন্য কারো জীবন জড়াতাম না৷ বেঁচে থাকার এত স্বপ্ন দেখতাম না। কিন্তু কেন আমার সাথে এত বড় অন্যায় করে গেলে বাবা??

পৃথিবীতে দুজন মানুষকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। একজন হলেন আমার বাবা যিনি আমার জন্মদাতা আর অন্য জন হলো ইমন যার জন্য আমার এই পৃথিবীতে আসা। আমি জানি ইমন আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। কিন্তু তাকে দেওয়া কথা যে আমি আর রাখতে পারলাম না। আমি যে এই পৃথিবীতে আর মাত্র কয়টা দিনের অতিথি। যেকোনো সময় আমার প্রাণটা দেহ ছেড়ে চলে যেতে পারে। আমার এই তিলে তিলে মরে যাওয়ার যন্ত্রণা ইমন সহ্য করতে পারবে না। আমার অনিশ্চিত জীবনের সাথে তার সুন্দর সুনিশ্চিত জীবন জড়িয়ে আর সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর জীবন থেকে সরে আসাটা মঙ্গল। তাই বাবাকে বলে সেদিন ইমনের অজান্তে তার চাকরিটা পাইয়ে দিলাম। এখন তাকে একটি বিশ্বাসযোগ্য হাতে তুলে দিতে পারলে আমি শান্তিমতো মরতে পারবো৷ সেজন্য ঐ দিন আমার বাল্য বন্ধু রেহানকে সাথে নিয়ে ইমনের সাথে মিথ্যা বিয়ের অভিনয় করলাম৷ যাতে সে আমাকে ভুল বুঝে আমার জীবন থেকে চলে যায়। আমি চাই আমার ভালোবাসার মানুষটা সবসময় ভালো থাকুক।

এদিকে নীলাকে ছাড়া ইমনের জীবনটা থমকে গেছে। সে অনেক বার নীলার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে কিন্তু বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। নীলাকে ছাড়া সে তার অস্তিত্বও কল্পনা করতে পারে না। নিজেকে সে শেষ করে দিতে প্রস্তুত তবুও নীলাকে কিছুতেই ভুলতে পারবে না। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করে না, ঘুমায় না একসময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। নীলার চলে যাওয়া সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না৷ তার এই অবস্থা দেখে তার বাবা মা সিদ্ধান্ত নিলেন অন্য কোনো মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিবেন নীলার বিয়ের আগে। কিন্তু ইমন বিয়ে করতে রাজি না। অবশেষে তার মা হুমকি দিয়ে জোর করে তার মামাতো বোন মিতুর সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু ইমন মিতুকে কোনোদিনও নীলার জায়গা দিতে পারবে না সেটা জেনেও মিতু ইমনকে বিয়ে করেছে। কারণ, সেই ছোটবেলা থেকে মিতু ইমনকে ভালোবাসে তবে ভালোবাসাটা ছিল শুধুই একতরফা। কিন্তু আজকের এই সুযোগ মিতু হাত ছাড়া করেনি। সে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও ইমনকে পেতে চায়।

এক সপ্তাহের ভিতরে ইমন আর মিতুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। অন্যদিকে নীলা রেহানকে দিয়ে ইমনের সব খবরাখবর রাখে। মিতুর সাথে ইমনের বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে সে অনেক কান্নাকাটি করে কিন্তু নিয়তির খেলা মেনে নিতেই হবে। তবে ভালোই হয়েছে, ইমনকে একটি সুন্দর জীবনে রেখে যেতে পারছে এটাই তো অনেক। সে তো সবসময় চেয়েছে তার ভালোবাসার মানুষটি সুখে থাকুক। তাহলে আজ কাঁদছে কেন? আজকে তো ওর খুশি থাকার কথা।

আজ মিতু আর ইমনের বিয়ে হয়েছে। মিতু ফুলসজ্জার খাটে বসে আছে আর ইমন সোফায় বসে সিগারেট খাচ্ছে। একদিন এই সিগারেটের জন্য তাকে কত কথা শুনতে হয়েছে অথচ আজ মন খুলে সিগারেট খাচ্ছে। কেউ বাঁধা দিচ্ছে না৷ কারণ সব জায়গা সবাই দখল করতে পারে না, মিতুকে সে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিবে না। পুরুষরা কখনো কান্না করে না, তাদেরকে কাঁদতে নেই তবুও আজকে ইমন বাচ্চাদের মতো কান্না করছে। বাহিরে দেখা না গেলেও ভেতরে ভেতরে কষ্টে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। শেষমেশ এটাই কি হবার ছিল? বার বার নিজের কাছে সে প্রশ্ন করছে। হঠাৎ সামনে টেলিফোনের শব্দ । ইমন গিয়ে টেলিফোন রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসলো। রেহান কাঁদো কাঁদো কন্ঠে কি যেন বলতে লাগলো। কথা শেষ না হতেই ইমনের হাত থেকে টেলিফোন নিচে পড়ে গেল। নীলা বলে সে চিৎকার দিয়ে উঠলো। রেহার তাকে কল দিয়ে বলেছে নীলার অবস্থা খুব খারাপ যদি শেষ দেখা দেখতে চায় তাহলে ঢাকা মেডিক্যালের ১২ নাম্বার কেবিনে যেন দ্রুত চলে আসে।

একটু আগে আমার জ্ঞান ফিরেছে। আমি নিজেকে হসপিটালের একটি বেডে আবিস্কার করলাম। চোখ খুলেই দেখতে পাচ্ছি এক পাশে বাবার কান্না ভেজা চোখ আর অসহায় চেহারা। অন্য পাশে ইমন । ইমনের সাথে তার সদ্য বিবাহিত বউ মিতু এসেছে। একসময় মিতুকে ইমনের সাথে দেখলে আমি অনেক হিংসা করতাম। ওকে একদম সহ্য করতে পারতাম না। কারণ আমি জানতাম মিতু ইমনকে ভালোবাসে সেজন্য ওর প্রতি আমার হিংসা থাকতো বেশি। যদিও মিতুর ভালোবাসা ছিল একতরফা, কারণ ইমন শুধুই আমাকে ভালোবাসতো তবুও মিতুকে আমি দু’চোখে দেখতে পারতাম না। কিন্তু নিয়তি আজ আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে সেই অপছন্দের মেয়েটির হাতে আমার ভালোবাসার মানুষটিকে তুলে দিতে হচ্ছে। বেঁচে থাকলে হয়তো এই দৃশ্যটা আমি সহ্য করতে পারতাম না, কিন্তু মৃত্যুর কোলে শুয়ে আজ সেই দৃশ্যটা দেখতে আমাকে নিজেই উৎসাহী হতে হচ্ছে। মনে কষ্ট পাবার বদলে আমি সুখ অনুভব করছি। আমি ইমন আর মিতুকে আমার দিকে একটু আসার জন্য ডাক দিলাম।

তোমাদের দুজনের হাতটা একটু এগিয়ে দিবে? তারা তাদের হাত এগিয়ে দিলো আমার দিকে। আমি মিতুর হাতে ইমনের হাত রেখে বললাম আজ থেকে আমার ভালোবাসার মানুষটির দায়িত্ব তোমার। ওকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। কখনো কষ্ট দিওনা যত্ন করে আগলে রেখো। আর ইমন সেদিনের ব্যবহারের জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। বিশ্বাস করো এগুলো একটাও আমার মনের কথা ছিল না। আমি তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি দুজনের হাত এক করে দিলাম। এক চোখে আমার না পাওয়ার বেদনার অশ্রু আর অন্য চোখে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কথাগুলো মুখ দিয়ে বলছি কিন্তু কষ্ট আমার ভিতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কি হতো আমাকে আর কয়টা দিন এই মানুষদের সাথে বেঁচে থাকতে দিলে? খুব বেশি কি ক্ষতি হয়ে যেতো? কেন আমার ভাগ্যে এমন লেখা ছিলো! নিয়তি কেন এত নিষ্ঠুর?

ইমন তুমি একটু আমার কাছে আসবে? খুব কাছে। আমাকে শেষ মুহূর্তে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে? আমার কথাগুলো শুনে ইমন খুব অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এখন সে আমার এতটা কাছে যে তার গরম নিঃশ্বাস এখন আমার গালে পড়ছে। তাঁর লাল হয়ে যাওয়া ভেজা চোখ, কাঁপা হাত, ভীত চাহনিতে এত মায়া কেন? আমিতো নতুন করে তার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি। এতদিন তার কারণে আমার গাল অশ্রুতে ভিজত। আজ তাঁর চোখের পানি পড়ছে আমার গালে। কখনও ভাবিনি, আমার গাল অন্য কারো চোখের পানিতে ভিজবে। আচ্ছা পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি কিছু পাবার আছে? আমি খুব করে চাইতাম, একদিন সে আমার জন্য কাঁদুক! জীবনের চাওয়া গুলো কতো অদ্ভুত। পেয়ে ফেলার পর মনে হয়, ঠিক এটাই কি চেয়েছিলাম?

এদিকে আমার ঘুমের সময় হলে গেলো! পৃথিবীতে এত দামী দামী মানুষ আর অনুভূতি নিয়ে কয়জন মানুষ ঘুমাতে পারে? একি, এত দামী উপহার পেয়েও আমার অশ্রুসজল চোখে ঝাপসা দেখছি কেন? কয়জন মানুষ বিদায়ের গভীর অন্ধকার দেখার আগে ঝাপসা আর ভেজা চোখে ভালোবাসার মানুষকে দেখতে পায়? কিন্তু আমিতো দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি আর কি বা পাবার আছে?

[ লেখক: মাহদিয়া আঞ্জুম মাহি, ছাত্রী- সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ]

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ লেখালেখি/ এমএএম/ এমএআই

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন