রবিবার, ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

দোয়ারাবাজারে অভাব অনটনে চরম কষ্টে দিন কাটছে এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের

খবরটি শেয়ার করুন:

আশিস রহমান ::

একাত্তরের রণাঙ্গনের যুদ্ধাহত প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গুলজার আলী। শেষে বয়সে এসে বিভিন্ন জটিল রোগের সাথে লড়ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় চলতি বছরে গত ২ মার্চ তিনি নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।জীবিত থাকাবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সম্মানী ভাতা পেতেন তা দিয়েই তার চিকিৎসা খরচ ও সংসারের ব্যয় বহন করা হতো। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে প্রায় চারমাস যাবৎ আটকে আছে তার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা।

✅ আপনাদের ভালোবাসায়

প্রয়াত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গুলজার আলী সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের জিরার গাঁও গ্রামের বাসিন্দা। গুলজার আলীর অবর্তমানে এখন তার পরিবার পরিজনরা চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে। বাড়িতে আয় রুজি করা মতো কর্মক্ষম কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ভরসা খোঁজে পাচ্ছেন না তারা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গুলজার আলীর কোনো পুত্র সন্তান নেই। উত্তরসূরির মধ্যে স্ত্রী ফুলেছা বেগম এবং আফিয়া খাতুন ও রোকেয়া খাতুন নামে দুই কন্যা সন্তান ও নাতি নাতনীরা রয়েছেন।

কনিষ্ঠ সন্তান রোকেয়া খাতুনের স্বামী অন্যত্র চলে যাওয়ায় তিনি তার ৩ সন্তান নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাবা গুলজার আলীর আশ্রয়ে আছেন। বড় সন্তান আফিয়া খাতুনের বিয়ে হয়েছে পার্শ্ববর্তী এলাকায়। তিনি ৪ সন্তানের জননী। তার স্বামীর আর্থিক অবস্থা পূর্ব থেকেই খারাপ। গুলজার আলী জীবিত থাকাবস্থায় তাদেরকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করতেন। তা দিয়ে কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে চলতো আফিয়া খাতুনের পরিবার।

সরেজমিনে গিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখা যায়, জিরার গাঁও গ্রামে প্রয়াত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গুলজার আলীর জীর্ণশীর্ণ টিনসেডের একটা বাড়ি। এ বাড়িতেই কনিষ্ঠ সন্তান রোকেয়া খাতুন ও ৩ নাতি-নাতনীদের নিয়ে বাস করছেন গুলজার আলীর বয়োবৃদ্ধ স্ত্রী ফুলেছা বেগম। সামান্য জমির বসত ভিটার এই ছোট্ট ঘরটি ছাড়া আর কোনো ফসলি জমি নেই তাদের।

আলাপকালে অসুস্থ ফুলেছা বেগম প্রতিবেদককে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় আছি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিনা। ঘরে খাবারও নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর আজোবধি কেউ কোনো ধরনের খোঁজখবর রাখেনি। লজ্জা শরমের ভয়ে কারো কাছে হাতও পাততে পারছিনা। প্রায় চারমাস ধরে স্বামীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা আটকে আছে। ভাতাটুকু পেলে অন্তত পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হতোনা। মেম্বার-চেয়ারম্যানরাও কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করেনা। তাদের কাছে গেলে বলে তুমি মু্ক্তিযোদ্ধার বউ। সরকার মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে এমনিতেই অনেক সহযোগিতা করে। ছোট্ট মেয়ের ঘরের এক নাতি এতোদিন এক বেকারিতে চাকরি করে সংসারে কিছু টাকা পাঠাতো। করোনায় এখন তার চাকরিটাও বন্ধ। সেও বাড়িতে বেকার পড়ে আছে। এখন ঋন করে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে বেচেঁ আছি। আমাদেরকে দেখার কেউ নেই।’

যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গুলজার আলীর ভাতা পাওয়ার প্রসঙ্গে ইতোমধ্যে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মহাপরিচালকের বরাবর একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তার কল্যাণ ট্রাস্ট নং-২৪৭০৬ এবং লাল মুক্তিবার্তা নং-০৫০২০৯০২২৪।

এব্যাপারে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে দোয়ারাবাজার উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফর আলী বলেন, গুলজার আলী একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি আহতও হয়েছিলেন। আমরা যারা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু যারা যুদ্ধাহত তাদেরকে ভাতা দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে। আমি যতোদূর জানি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট নতুন একটা নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে। সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে একধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে যেকারণে গুলজার আলীসহ তারমতো আরো অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা আটকে আছে। তাদের ব্যাপারে যদি নতুন কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হতো তাহলে আমরা গুলজার আলীর পরিবারকে আমাদের মতো সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার ভাতার আওতাভুক্ত করতে পারতাম।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক, সিনিয়র আইনজীবী বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘আমি প্রয়াত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা গুলজার আলীর পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি। তারা খুবই কষ্টে আছেন। কি কারণে তার ভাতা আটকে আছে জানিনা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একজন প্রয়াত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার পরিবার পরিজন না খেয়ে মরবে। আমি এই পরিবারটির পাশে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়সহ, প্রশাসন ও সমাজের সুহৃদয়বান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাই।’

সুনামগঞ্জ২৪.কম/এআর/এসএইচএস

খবরটি শেয়ার করুন:

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন

✅ বিজ্ঞাপন