বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ অক্টোবর ২০১৯ ইং

শিক্ষার্থীদের চোখে প্রিয় সুনামগঞ্জ

নিউজটি শেয়ার করুন

দূর্বার শামিত আদি, প্রতিবেদক(শিশু মেলা)::

“এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়? ” কথাটা যেন আমাদের ছোট্ট ছিমছাম শহরের নাগরিকদের বাস্তবতা। প্রয়াত মউজদীন তার কবিতায় প্রিয় শহরকে তাই তোলে ধরেছিলেন। যাবতীয় অধিক যান্ত্রিকতা থেকে দূরে এক আলোর শহর সুনামগঞ্জ। শান্তির আবাস যেনো শহরটা। প্রকৃতি তার সমস্ত রং নিয়ে সাজিয়েছে এই হাওরকন্যাকে। প্রিয় “সুনামগঞ্জ” নিয়ে কেমন ধারণা আমাদের ক্ষুদে পাঠকদের? কিসের অভাব অনুভব করে তারা? কিংবা জেলা শহর ও এই জনপদকে কেমন দেখতে আশা করে তারা? এসব জানতেই স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে সুনামগঞ্জ২৪.কম। গল্পে গল্পে এসব কথাই উঠে আসে শিশু মেলায়।

শিক্ষার্থীদের প্রাণের শহর নিয়ে উঠে আসে নানান ভালোবাসার কথা কিংবা মন খারাপ করা কিছু ভোগান্তির কথা। প্রিয় সুনামগঞ্জ নিয়ে নিজের অভিমত ব্যাক্ত করেছে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত তাহমিদ জাহান। তার অভিব্যক্তি “সুনামগঞ্জ শহরের অলি গলি ঘুরে বেড়ানোর
অভ্যাস বেশ দিন ধরেই আছে। স্কুল থেকে আসার সময় খামখাই একদিন নতুনপাড়া, একদিন বাঁধন পাড়া ঘুরে ফিরি। আমার শহরের এলাকা গুলোতে অপরিচিত মানুষের সাথে সবার খুব সহজে মিশে যাওয়াটা খুব ভালো বিষয়। কিন্তু যে বিষয়টা আমার বেশ খারাপ মনে হয় সেটা হলো স্কুল পড়ুয়া কিছু ছেলে সিগারেটে আসক্ত হয়ে পরেছে। এ বিষয়গুলা খুব খারাপ লাগে। আর শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পথশিশুদের জন্য যদিও ইতিমধ্যে অনেক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা হয়েছে তবুও আমি এই শিশুদের জন্য শহরের অভিভাবকদের এগিয়ে আসার অনুরোধ রাখবো।”

সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী সমিকা ইসলাম শূচী আবার তার প্রিয় শহরের
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্টতা নিয়ে জানায় তার ভালোবাসার কথা। শূচীর অভিব্যাক্তি “খুব যান্ত্রিক না হলেও এই শহরে দূষণটাও কম হয় না। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের মাঝেও এখানে দূষণ বিবেচিত এক বিষয়। মানুষের আর যাই আসুক সচেতনতা টা একটু কমই। বাস, ট্রাক, সিএনজি আর ছোট ছোট কারখানার ধোঁয়া আজ আমার শহরের নির্মল বায়ুকে নষ্ট করে দিচ্ছে, নষ্ট করছে আমার শহরের এই সাদা মেঘের আবরণকে। জলাশয়গুলো ভরাট করে পরিকল্পনায় আনা হচ্ছে নতুন নতুন স্থাপনা। শহরের এক কোণায় যখন গিয়ে একটু বসা যায়,মনে হয় আমি এই শহরের এক শান্ত প্রকৃতিতে ডুবে আছি, যাতে আছে এক প্রবাহিত শীতল নদী আর এক মায়াবী সূর্য। হ্যাঁ-শহরটা আমার। ভালোবাসলে আমিই বাসবো। শহরটাকে নিজের মনমতো বানাতে হলে আমাকেই বুঝে উঠতে হবে, নাইলে আমার শহরটা হয়তো কোনো বন্যার জলে ভেসে যাবে। না, এটা আমার ইচ্ছা নয়। প্রকৃতি আর এই শহরটার প্রতিটা দান আমার সংগ্রহে আমার দায়িত্বতেই গড়ে তুলতে হবে। ভালোবাসি খুব শহরটাকে।”

সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর দুই ছাত্র অর্ণব দাশ নির্জন এবং অর্ণব বণিকের শহরকে
নিয়ে চিন্তা ভাবনায় ছিলো বেশ পার্থক্য। অর্ণব দাশ নির্জনের মতে প্রাণপ্রিয় এই শহরের অবকাঠামোগত
দিকথেকে বেশকিছু উন্নয়ন প্রয়োজন। যেমন সুনামগঞ্জে অনেক আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান
রয়েছে কিন্তু সেখানের যাতায়াত ব্যবস্থা বেশি সুবিধাজনক না। এদিক থেকে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা বেশ দরকার। তাছাড়া শহরের বিদ্যালয়গুলোর সামনে দেওয়া জেব্রাক্রসিং-এর ব্যবহার নিয়েও কথা উঠে। খুবই ভালো এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ সেটা। কিন্তু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারাটা হয়তো এখনো বাকি। একইসাথে শহরে বিজ্ঞান অনুশীলনের জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করারও অনুরোধ ধরা পড়ে তার বক্তব্যে। অন্যদিকে, অর্ণব বণিক শহরকে এমন এক জায়গায় দেখতে চান যেনো কেউ তার প্রিয় সুনামগঞ্জকে ছোট করে দেখার অবকাশ না পায়। শহরটার ইতিমধ্যে যে পরিমাণ উন্নয়ন শুরু হয়েছে, সেটাই যথেষ্ট তার স্বপ্নের জায়গায় শহরটাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে ধারণা তার। সমৃদ্ধ, উন্নত শহরের স্বপ্নে সে বিভোর।

জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ২০১৬ তে রবীন্দ্র, নজরুল ও দেশাত্মবোধক সংগীতে প্রথম স্থান অধিকার করা এসসি বালিকার দশম শ্রেণীর ছাত্রী অরুণিমা দাশ শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে তার স্বপ্নের কথা জানায়। তার মতে “সুনামগঞ্জ সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলেই জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য গীতিকার। তাদের মধ্যে মরমী কবি হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুর করিম, কবি দুর্বিন শাহ্ সহ নাম না জানা কত গুণীজন রয়েছেন। তাঁরা রচনা করেছেন কয়েক লক্ষ গীতি কবিতা । যার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান মেলা ভার। মন কেড়ে নেয়ার মতো অদ্ভুত এক যাদু রয়েছে সেই সকল রচনায়, গানের সুরে। কিন্তু সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো অনেক গীতিকার আছেন যারা প্রয়োজনীয় সুযোগ ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে তাঁদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে অসামর্থ। অবহেলায় পড়ে থাকছে সেই সকল প্রতিভাবান গীতিকারদের প্রশংসনীয় সৃষ্টি। এসব সৃজনশীলতা পাচ্ছে না কোনো স্বীকৃতি। আবার এ অঞ্চলের মাঠ-ঘাট,আকাশ-বাতাস সর্বদাই মুখরিত হয়ে থাকে মাঝির স্বতঃস্ফূর্ত গানের সুরে,কৃষকের গুন গুনানিতে।

এখানকার গ্রাম গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত চলে সংগীতের চর্চা। এ অঞ্চলের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন অসংখ্য সুরেলা মেধাবী শিল্পী। সাংস্কৃতিক রাজধানী হওয়া সত্ত্বেও সুনামগঞ্জের এই সকল প্রতিভাবান শিল্পীরা পাচ্ছেননা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা। তাঁরা পাচ্ছেন না তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান। তাঁদের যোগ্য সম্মান তথা আমাদের সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধনের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, মনোবল এবং অক্লান্ত পরিশ্রম। দরকার সকলের অংশগ্রহণ, মিলিত প্রচেষ্টা। তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের উচিত সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষে কাজ করা । তাই আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে এ লক্ষে কাজ করি তবেই আমাদের সংস্কৃতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। সাংস্কৃতিক রাজধানী সুনামগঞ্জ কে এনে দিতে পারবো বিশ্ব স্বীকৃতি।”

সুনামগঞ্জ শহরকে ঘিরে এভাবেই সুনামগঞ্জ২৪.কম এর ক্ষুদে পাঠকদের চাওয়া,পাওয়া, দাবি-দাওয়া আর এসবের সাথে একরাশ আবেগ- ভালোবাসার কথা উঠে আসে। প্রাণের শহরটা প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে নতুনের দিকে। আর সেই এগিয়ে যাওয়ার অংশ শহরের শিক্ষার্থীদের চিন্তা ভাবনার দরজা খুলে দিতেই এই প্রচেষ্টা।

সুনামগঞ্জ২৪.কম/ ডিএসএ/ এমএআই

নিউজটি শেয়ার করুন

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™

☑ বিজ্ঞাপন™