বৃহস্পতিবার, ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

দারিদ্রতা ঠেকাতে পারেনি প্রণয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানো

রাজন চন্দ (তাহিরপুর)::

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ লাগোয়া বৌলাই নদীর পাড়ে একটি খুপড়ি ঘরে বাস করেন নারায়ণ বর্মণের পরিবার। নারায়ণ বর্মণ নদী ও হাওরে মাছ ধরেন। স্ত্রী মণি বর্মণও পাথর ভাঙ্গার মেশিনে শ্রমিকের কাজ করেন।

এভাবেই দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে চলছে এ পরিবারটি। সম্প্রতি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে নারায়ণ ও মনি বর্মণ দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান মেধা তালিকায় ৪৩৬ নম্বর অবস্থান করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

এ খবর শুনে এলাকার লোকজন তার বাড়ি গেলে মণি বর্মণ বিলাপ করে কান্না শুরু করেন। তবে এ অশ্রু ছিল আনন্দ অশ্রু। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান প্রণয়ের এমন কৃতিত্বে এলাকার লোকজন চমকে উঠেছে। তবে এলাকাবাসীর আন্তরিক ভালবাসায় সিক্ত হচ্ছেন প্রণয়ের পরিবার।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সারাজীবন বাড়ির সামনে বৌলাই নদী আর নদী সংলগ মাটিয়ান, শনি আর টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরছেন নারায়ণ বর্মণ। পরিবার স্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে দুমুঠো ভাত খাওয়ার জন্য রোদ বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যেই প্রতিদিন নদী ও হাওরে জাল ফেলেছেন। আর সেই মাছ বিক্রি থেকে ভাতের যোগান হয় নারায়ণ বর্মণের পরিবারের। দিনরাত পরিশ্রম আর মাছের আকালে নারায়ণ বর্মণও এখন অনেকটাই কর্মহীন হয় পড়েছেন। বাধ্য হয়েই নারায়ণ বর্মণের স্ত্রী মনি বর্মণ গত সাত বছর ধরে বাড়ি হতে ৭ থেকে ১৫ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত উপজেলার আনোয়ারপুর ও লাউড়েরগড় এলাকায় পাথর ভাঙ্গার মেশিনে পাথর আনা নেওয়ার কাজ করেন। মনি বর্মন প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে অন্য মহিলাদের সাথে দলবেঁধে কাজের সন্ধানে ছুটে চলেন।

আর সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেন । বড় মেয়ে বন্যা বর্মণের বিয়ে হয়ছে দুই বছর আগে। লেখাপড়া করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। ছোট ছেলে সূর্য্য বর্মণ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন আর মা মণি বর্মণের সাথে মাঝেমধ্যে পাথর টানার কাজে যান।

মণি বর্মণ বলেন, পুলাপানরে ঠিকমতো ভাতেই খাওয়াইতে পারিনা। পড়াইতাম ক্যামনে। তবুও জীবন দিয়া চেষ্টা করতাছি আমার এই পুলাডা যাতে পড়তে পারে। পাথর টানতে গিয়ে অনেকবার মাথা ফাটছে, নাক ফাটছে। এখন আর মনে কোন দুঃখ নাই। পোলা আমার যদি ডাক্তার অইতে পারে তবেই জীবন আমার স্বার্থক। এখন পুলারে পড়ানির কোন ট্যাকা নাই আমার। ভয়ে আছি টাকার লাগি যদি এখন পড়তে না পারে।

মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রণয় বর্মণ বাড়ির সামনে অবস্থিত মধ্য তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, তাহিরপুর সরকারি উচ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

প্রণয় বর্মণ বলেন, মা-বাবার অমানুষিক শ্রমে আমার এই অর্জন। আমার লক্ষ্য ছিল দেশসেবায় আমি চিকিৎসক হবো। তবে বর্তমানে আমি আগামী দিনের লেখাপড়ার খরচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি।

তাহিরপুর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি অজয় কুমার দে বলেন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে তাহিরপুর। শিক্ষায় বিনয়োগে হাওরাঞ্চলের মানুষের আগ্রহ কম। দারিদ্র্যর সাথে সংগ্রাম করে প্রণয়ের এমন ফলাফল এলাকার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।

তাহিরপুর উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ বলেন, চেষ্টা আর আগ্রহ থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছা যায় প্রণয় বর্মণ তা দেখিয়েছে। তাছাড়া সরকার এখন শিক্ষায় নানা ধরণের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রণয় বর্মণের যে কোন সহযোগীতায় আমি সর্বাত্মকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করব।

 

error: Content is protected !!